
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: কাগজে উন্নয়ন, বাস্তবে ধ্বংসস্তূপ—ত্রিশাল উপজেলা যেন এখন দুর্নীতির এক উন্মুক্ত প্রদর্শনী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ‘ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক চেলেরঘাট–আমতলী জিসি রোড (ভায়া চান্দেরটেকি)’ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো—যার নামে কাজ দেখানো হয়েছে, সেই ঠিকাদারের অস্তিত্বই নাকি নেই!
২০২২–২৩ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর আওতায় এমআরআরআইডিপি (MRRIDP) প্রকল্পের মাধ্যমে ২.৮ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু পেভমেন্ট ও সারফেসিংয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালেও সড়কটির অবস্থা বেহাল—পিচ ঢালাই তো দূরের কথা, স্বাভাবিক চলাচলই দুঃসাধ্য।
বালুর বদলে মাটি, ইটের বদলে নিম্নমানের খোয়া
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নামে নিম্নমানের কাজ হয়েছে। বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহার এবং মানসম্মত ইটের বদলে ২ ও ৩ নম্বর নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এক বাসিন্দা মরিয়ম বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“ইঞ্জিনিয়াররা আসে শুধু ঠিকাদারের সাথে চা খাইতে। এভাবে কাজ করলে রাস্তা টিকবে কয়দিন?”
প্রকৌশলী-ঠিকাদার যোগসাজশের অভিযোগ
একাধিক সূত্রের দাবি, ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন ও সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের প্রত্যক্ষ মদদেই এই অনিয়ম হয়েছে। নথিতে সিল-স্বাক্ষর থাকলেও বাস্তবে তদারকির অভাব স্পষ্ট।
সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ, বাস্তবে শূন্য
নথি অনুযায়ী, সড়ক সুরক্ষা খাতে ২২ লাখ টাকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অথচ মাঠপর্যায়ে কোনো গাইডওয়াল, সাইনবোর্ড বা নিরাপত্তা চিহ্নের দেখা মেলেনি। প্রশ্ন উঠেছে—এই অর্থ ব্যয় হলো কোথায়?
‘আলম’ নামের ঠিকাদার—অস্তিত্ব নেই!
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—উপজেলা প্রকৌশলী যে ‘আলম’ নামের ঠিকাদারের কথা বলছেন, কাগজপত্র ঘেঁটে তার কোনো বৈধ নিবন্ধন বা ঠিকানার সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। তাহলে বরাদ্দকৃত অর্থ কারা তুলেছেন—তা নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে।
৭০ শতাংশ কাজের দাবি, এলাকাবাসীর মতে ৩০ শতাংশও নয়
সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, “৭০ শতাংশ কাজ শেষ।”
তবে এলাকাবাসীর বক্তব্য—নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ৩০ শতাংশ কাজও হয়নি।
তদন্ত ও শাস্তির দাবি
এলাকাবাসী অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। জড়িত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
ত্রিশালের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি আদৌ নির্মিত হবে, নাকি অনিয়ম-দুর্নীতির কবরেই চাপা পড়বে—এখন সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

Reporter Name 









