
উজ্জ্বল কুমার | নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি
নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও বদলগাছী উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ৪৮ নওগাঁ-৩ আসনে এবার নির্বাচনী লড়াই বেশ জমে উঠেছে। এ আসনে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থীরা হলেন—
ফজলে হুদা বাবুল (বিএনপি), মাহফুজুর রহমান (জামায়াত), নাছির বিন আছগর (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), মাসুদ রানা (জাতীয় পার্টি), কালিপদ সরকার (বাসদ), আব্দুল্লাহ আল মামুন সৈকত (বিএনএফ), পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি (স্বতন্ত্র) ও সাদ্দাম হোসেন (স্বতন্ত্র)।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি ও জামায়াত প্রার্থী মাহফুজুর রহমানের মধ্যে। যদিও আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় বিএনপির দলীয় প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন, তবে দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বিএনপির জন্য প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর আচরণ, আধিপত্য বিস্তার ও অপকর্মের অভিযোগে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতের প্রতি সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ আগের তুলনায় বেড়েছে।
একসময় বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত নওগাঁ-৩ আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে থাকলেও দলীয় ও উপদলীয় দ্বন্দ্বে চরমভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন, শেষ মুহূর্তে এই কোন্দল সামাল দিতে না পারলে বিএনপিকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
বিএনপির প্রার্থী ফজলে হুদা বাবুল বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। শুরুতে তিনি বদলগাছীতে উপজেলা বিএনপি ও মহাদেবপুরে উপজেলা কৃষক দলের ব্যানারে প্রচার চালান। তবে এই আসনে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীর বিরোধিতা ও বয়কট আন্দোলনের কারণে মাঠের চিত্র জটিল হয়ে ওঠে। অনেকেই মনে করছেন, দলের ভেতর থেকেই গোপনে অন্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা প্রয়াত আখতার হামিদ সিদ্দিকী নান্নুর পুত্র। তার পিতার সময়ে এ এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হওয়ায় এখনো অনেক ভোটার তাকে ‘জনতার এমপি’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে না এলেও নীরবে তার পক্ষে কাজ করছে। পাশাপাশি মহাদেবপুর উপজেলার আঞ্চলিক ভোট এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট ব্যাংকও তার দিকে ঝুঁকছে বলে আলোচনা রয়েছে।
এদিকে বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সুযোগে জামায়াত প্রার্থী মাহফুজুর রহমান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। জামায়াতের নারী সংগঠনের ব্যাপক মাঠপর্যায়ের কাজ ভোটের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখছে। এই আসনে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটার বেশি হওয়ায় বিষয়টিকে কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে জামায়াত।
বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে, জুলাই আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ তরুণ ভোটারদের একটি অংশও জামায়াত জোটের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নওগাঁ-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৮ জন, নারী ২ লাখ ২১ হাজার ৭৯৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ জন।
ইতোমধ্যে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রচারণার শেষ দিনে সোমবার দুপুরে জামায়াত মহাদেবপুর হাইস্কুল মাঠে বিশাল জনসভা ও মিছিল করে। সন্ধ্যায় স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকীর সমর্থকেরা স্মরণকালের অন্যতম বড় মিছিল বের করেন।
সব মিলিয়ে নওগাঁ-৩ আসনের নির্বাচনী লড়াই এখন হাড্ডাহাড্ডি ও অনিশ্চিত—শেষ পর্যন্ত কার হাসি ফুটবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নওগাঁ 🗳️

Reporter Name 























