
চট্টগ্রাম নগরের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় মোট ১৮ ধরনের নগর ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) নগরের চারটি ওয়ার্ডে এই গবেষণা পরিচালনা করে। পরে গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে নগরের একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত অনুষ্ঠানে “নগর ঝুঁকি নিরূপণ ও ঝুঁকি হ্রাস কর্মপরিকল্পনা” শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। গবেষণাটি চট্টগ্রামের পাহাড়ধসপ্রবণ চারটি ওয়ার্ডে পরিচালিত হয়। এগুলো হলো— ৭ নম্বর পশ্চিম ষোলশহর, ৮ নম্বর শুলকবহর, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী এবং ১৪ নম্বর লালখানবাজার।
গবেষণায় চিহ্নিত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ধস, মশাবাহিত রোগ, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, গ্যাস বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, জলাবদ্ধতা, ঝিলের পানিতে ডুবে মৃত্যু, পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির সংকট, তাপদাহ, সড়ক দুর্ঘটনা, মাদক সমস্যা, পানি সংকট, পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং নালায় পড়ে মৃত্যু।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, নগরের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো অপরিকল্পিত নগরায়ণ। পাহাড় কাটা, অনিয়ন্ত্রিত বসতি এবং সীমিত অবকাঠামোর কারণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় কমিউনিটির অভিজ্ঞতা ও মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় মানুষই তাদের এলাকার প্রকৃত সমস্যা সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরতে পারেন। যদিও কমিউনিটি পর্যায়ে পাওয়া সব মতামত সরাসরি গ্রহণ করা সম্ভব নয়, তবে বিশেষজ্ঞ মতামত ও কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
গবেষণা প্রতিবেদনে নগরের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির নিষ্ক্রিয়তা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব সমস্যার সমাধান করা গেলে নগরবাসীর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
জানা গেছে, জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিস (GFFO) এবং ইকো হিপ-এর অর্থায়নে, সেভ দ্য চিলড্রেন-এর সহায়তায় এবং রাইমস-এর কারিগরি সহযোগিতায় ইপসা এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। “অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন” নামের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবন ও সম্পদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা।
প্রকল্পের আওতায় সংশ্লিষ্ট চারটি ওয়ার্ডে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ধসের আগাম সতর্কবার্তা তৈরি, ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রটোকল তৈরিতে সহায়তা করা।
এই চট্টগ্রাম নগর ঝুঁকি গবেষণা পরিচালনার সময় স্থানীয় কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। গবেষণার জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক পরিদর্শন, গ্রুপ আলোচনা, কমিউনিটি সেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কী-ইনফরমেন্ট ইন্টারভিউ (KII) নেওয়া হয়। এতে স্থানীয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত গবেষণায় প্রতিফলিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও জেলা জজ মহিউদ্দিন মুরাদ, অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট মো. সোয়েব উদ্দিন খান, বাংলাদেশ আবহাওয়া ও সম্প্রচার অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুর রহমান খান, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ সাহাব উদ্দিন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল আলিম এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক।
এছাড়া জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামাজিক উন্নয়ন কর্মকর্তা গোলাম মোর্শেদ, ইপসার পরিচালক (সামাজিক উন্নয়ন) নাছিম বানু এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর অঞ্চল ও নগর পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহজালাল মিশুক, ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক অতিশ চাকমা, সাংবাদিক ইফতেখারুল ইসলাম, মোরশেদ তালুকদারসহ বিভিন্ন পেশাজীবী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গবেষণার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন ইপসার প্রোগ্রাম ম্যানেজার (মনিটরিং অ্যান্ড রিসার্চ) ড. মোরশেদ হাসান মোল্লা। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইপসার প্রজেক্ট অফিসার মুহাম্মদ আতাউল হাকিম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চট্টগ্রাম নগর ঝুঁকি গবেষণা নগরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-কে ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

Reporter Name 









