
শবে বরাতের তাৎপর্য ও ফযিলত আল্লামা মুফতী মুজাহিদ উদ্দীন চৌধুরী দুবাগী (রহ.)শবে বরাত তথা শা’বান মাসের পনেরই রাত ইসলামের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ফযিলতপূর্ণ রাত। এ রাতের অস্তিত্ব, গুরুত্ব ও ফযিলত নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলেও সহিহ হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং মুহাদ্দিসিনে কেরামের ইজমার মাধ্যমে এ রাতের মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
বিশ্বস্ত হাদিস গ্রন্থ জামে তিরমিযি, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ, শুয়াবুল ঈমান, মুস্তাদরাকে হাকিমসহ অসংখ্য কিতাবে শবে বরাতের ফযিলত সম্পর্কে পৃথক অধ্যায় রচিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযি (র.) নিজেই “লাইলাতু নিসফি শা’বান” শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন, যা প্রমাণ করে যে এ রাতের বিশেষত্ব তিনি নিজ আকিদা থেকেই স্বীকার করেছেন।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে—এক রাতে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ঘরে না পেয়ে জান্নাতুল বাকীতে খুঁজে পান। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“এটি শা’বান মাসের পনেরই রাত। এ রাতে আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বনী কলব গোত্রের ছাগলের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।”
(মুসনাদে আহমদ)
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়—
১) শবে বরাত একটি ফযিলতপূর্ণ রাত
২) এ রাতে ইবাদত ও কবর জিয়ারত নবীজির (সা.) সুন্নাত দ্বারা প্রমাণিত
সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
“যখন শা’বানের পনেরই রাত আসে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখো। কারণ সূর্যাস্তের পর থেকেই আল্লাহ তা’য়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে ফজর পর্যন্ত ঘোষণা দিতে থাকেন— কে আছে ক্ষমা প্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করব।”
মুহাদ্দিসিনে কেরামের মতে, এ হাদিসসমূহ একাধিক সাহাবি থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হওয়ায় তা সম্মিলিতভাবে শক্তিশালী (হাসান লিগাইরিহি) হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এমনকি ফযিলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস দ্বারা আমল করাও উসুলে হাদিস অনুযায়ী বৈধ।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.) ফাতওয়া (৩০তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪২)-এ উল্লেখ করেন—
“শা’বানের পনেরই রাতের ফযিলত সম্পর্কে বহু হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য রয়েছে। সালফে সালেহীন এ রাতে বিশেষভাবে ইবাদত করতেন।”
ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন—
“শবেকদর ছাড়া পাঁচটি রাত রয়েছে, যেগুলোতে দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না— জুমার রাত, দুই ঈদের রাত, রজবের প্রথম রাত ও শা’বানের পনেরই রাত।”
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র.) তাঁর গভর্নরদের নির্দেশ দিয়েছিলেন—শবেকদর ব্যতীত চারটি রাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদতে কাটানোর জন্য, যার মধ্যে শবে বরাত অন্যতম।
ফারসি ও উর্দু ভাষায় এ রাতকে “শবে বরাত” বলা হয়, যার অর্থ— জাহান্নাম থেকে মুক্তির রাত (লাইলাতুল বারাআত)। এ রাতে আল্লাহ তা’য়ালা মুশরিক ও হিংসাপরায়ণ ব্যক্তি ব্যতীত সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন বলে হাদিসে এসেছে।
অতএব, শবে বরাতকে অস্বীকার করা বা এটিকে নিছক রসম হিসেবে আখ্যায়িত করা হাদিস, ফিকহ ও ইসলামী ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ। সহিহ আকিদা অনুযায়ী এ রাত ইবাদত, তওবা, ইস্তেগফার ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে শবে বরাতের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Reporter Name 









