গাজীপুর , সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ খবর :
ভোটের হাওয়া
পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ নির্বাচন: প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমঅধিকার দাবি কালিয়াকৈরে মানবিক নেতা সাইজুদ্দিন আহমেদ কালিয়াকৈর পৌরসভা: দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত উদ্যোগে জসিম উদ্দিন চট্টগ্রামে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মিদের খুঁজছে পুলিশ গাজীপুরে ঝুট ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা, লুটপাট ও ককটেল সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় নাসরিন রহমান পপি শহরের মতো গ্রাম গড়ার অঙ্গীকার আলা উদ্দিনের শ্রীপুরে মাওনা–উজিলাব সড়ক উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন নকলায় এমপির সাথে এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক নেতাদের সাক্ষাৎ চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৪ এপ্রিল

আইন বনাম দাবি: চসিক মেয়রের পদে থাকা নিয়ে শুরু আইনি লড়াই

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২২ Time View

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি)। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয়। সে হিসাবে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজই বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

তবে মেয়াদ শেষ হলেও নিজের চেয়ার ছাড়তে নারাজ বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ নিয়ে নগরীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আইনি বিতর্ক।

মেয়রের দাবি কী?

মেয়রের দাবি, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ‘সেকশন সিক্স’ প্রযোজ্য হবে এবং প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই।

আইন কী বলছে?

আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, মেয়র যে ধারার কথা বলছেন, সেটির রক্ষাকবচ ২০১১ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে।

২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ৬ নম্বর ধারার আগের সেই শর্ত তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে ধারাটিতে শুধু বলা আছে—করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।

পরিশিষ্ট অংশেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ পরিষদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে আইনবিদদের মতে, মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়রের ক্ষমতাও বিলুপ্ত হওয়ার কথা।

প্রশাসক নিয়োগের নজির

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে প্রশাসক নিয়োগের উদাহরণ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে নির্বাচন স্থগিত হলে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২০ সালের ৪ আগস্ট সরকার খোরশেদ আলম সুজন-কে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। সে সময়ও আইন অনুযায়ী বিদায়ী মেয়রকে দায়িত্বে রাখা হয়নি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক নিয়োগই একমাত্র আইনসম্মত পথ।

ধারা ৬০ কী বলছে?

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ৬০ ধারা (২০১১ সালের সংশোধনীসহ) অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে সরকার নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।

এই বিধান অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে আইনই এখানে চূড়ান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনের প্রস্তুতি

মেয়াদ শেষ হওয়ার টানাপোড়েনের মধ্যেই চট্টগ্রামসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-এ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে বলেও জানা গেছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজই মেয়াদ শেষ হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী মেয়াদের শেষ ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

যেভাবে মেয়র হন শাহাদাত

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালতের রায়ে ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয়।

২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী বিজয়ী হন। পরে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে মামলা হলে তিন বছর পর আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণা করে। ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তার মেয়র পদ নিশ্চিত করে।

এখন প্রশ্ন—আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কি মেয়র দায়িত্বে থাকবেন, নাকি প্রশাসক নিয়োগ হবে? চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গাজীপুরবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা শওকত হোসেন সরকারের

আইন বনাম দাবি: চসিক মেয়রের পদে থাকা নিয়ে শুরু আইনি লড়াই

Update Time : ০৪:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি)। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয়। সে হিসাবে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজই বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

তবে মেয়াদ শেষ হলেও নিজের চেয়ার ছাড়তে নারাজ বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ নিয়ে নগরীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আইনি বিতর্ক।

মেয়রের দাবি কী?

মেয়রের দাবি, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ‘সেকশন সিক্স’ প্রযোজ্য হবে এবং প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই।

আইন কী বলছে?

আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, মেয়র যে ধারার কথা বলছেন, সেটির রক্ষাকবচ ২০১১ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে।

২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ৬ নম্বর ধারার আগের সেই শর্ত তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে ধারাটিতে শুধু বলা আছে—করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।

পরিশিষ্ট অংশেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ পরিষদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে আইনবিদদের মতে, মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়রের ক্ষমতাও বিলুপ্ত হওয়ার কথা।

প্রশাসক নিয়োগের নজির

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে প্রশাসক নিয়োগের উদাহরণ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে নির্বাচন স্থগিত হলে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২০ সালের ৪ আগস্ট সরকার খোরশেদ আলম সুজন-কে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। সে সময়ও আইন অনুযায়ী বিদায়ী মেয়রকে দায়িত্বে রাখা হয়নি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসক নিয়োগই একমাত্র আইনসম্মত পথ।

ধারা ৬০ কী বলছে?

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯–এর ৬০ ধারা (২০১১ সালের সংশোধনীসহ) অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে সরকার নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।

এই বিধান অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে আইনই এখানে চূড়ান্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচনের প্রস্তুতি

মেয়াদ শেষ হওয়ার টানাপোড়েনের মধ্যেই চট্টগ্রামসহ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-এ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে বলেও জানা গেছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজই মেয়াদ শেষ হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী মেয়াদের শেষ ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

যেভাবে মেয়র হন শাহাদাত

২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালতের রায়ে ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয়।

২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী বিজয়ী হন। পরে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে মামলা হলে তিন বছর পর আদালতের রায়ে নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণা করে। ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তার মেয়র পদ নিশ্চিত করে।

এখন প্রশ্ন—আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কি মেয়র দায়িত্বে থাকবেন, নাকি প্রশাসক নিয়োগ হবে? চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।