
মাগুরায় অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর দুদকের অভিযান
মোঃ জুয়েল রানা | মাগুরা
প্রশিক্ষণের নামে সরকারি অর্থ তছরুপ ও নানা অনিয়মের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশের পর মাগুরায় অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য হলে যোগ করা যাবে) দুপুরে দুদকের একটি দল মাগুরা সদর উপজেলার “ড্রিম মাশরুম ভ্যালি” কার্যালয়ে গিয়ে কাগজপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে দুদক কর্মকর্তারা বিল-ভাউচার, প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নথিপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করেন।
বিশ্বব্যাংক ও সরকারের অর্থায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন পার্টনার–ডিএএম প্রকল্পের ‘অন দ্য জব’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মাগুরায় নানা অভিযোগ উঠে আসছিল। প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী ১২ দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ প্রশিক্ষণার্থীদের।
প্রশিক্ষণার্থীরা জানান, সরকারি অর্থে পিকনিক আয়োজনের কথা থাকলেও তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে আদায় করা হয়। ২৫ জনের একটি ব্যাচ থেকে প্রায় ৯ হাজার টাকা সংগ্রহ করে ঝিনাইদহের একটি পর্যটন স্পটে নেওয়া হয়। নীতিমালায় প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও এই আদায়কে তারা সরাসরি অনিয়ম বলে দাবি করেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ও অনুমোদিত প্রশিক্ষক ছাড়াই একাধিক ক্লাস পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, “ড্রিম মাশরুম ভ্যালি”-এর মালিক বাবুল নিজেই অন্তত পাঁচটি ক্লাস নিয়েছেন। তবে তিনি প্রকল্পের অনুমোদিত প্রশিক্ষক কি না, সে বিষয়ে কোনো বৈধ তালিকা বা নথি দেখাতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের পরিবর্তে কেবল কাগুজে উপস্থিতি দেখিয়েই কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বরাদ্দ ব্যাগ, এপ্রোন ও টি-শার্ট অনেকেই পাননি। যেগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খাবারের মান ছিল নিম্নমানের এবং অনেক প্রশিক্ষণার্থীকে নিজ বাড়ি থেকে যাতায়াত করতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা জেলায় ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে ৩০০ জনকে। প্রতি বছর তিনটি উপজেলা থেকে ১০০ জন করে প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও শালিখা উপজেলা ধারাবাহিকভাবে বাদ পড়েছে। ২০২৪ সালে প্রকল্প শুরু হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১০০ জন প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এছাড়া ১২ দিনের প্রশিক্ষণ ১১ দিনেই শেষ করে সমাপনী করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মাগুরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মো. রবিউল ইসলাম বলেন,
“প্রশিক্ষণ যেভাবে হওয়ার কথা, বাস্তবে সব জায়গায় শতভাগ মানা যাচ্ছে না। মান নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে।”
ঢাকায় প্রকল্প কার্যালয় সূত্র জানায়, মাগুরায় নয়টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে।
এদিকে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে “ড্রিম মাশরুম ভ্যালি”-এর মালিক বাবুলের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক আনসার সদস্যের ছেলে বাবুল কীভাবে অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তারা বলছেন, সাধারণ মাশরুম ব্যবসা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে এমন সম্পদ অর্জন বাস্তবসম্মত নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাবুল অতীতে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা, বঙ্গবন্ধু সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও কৃষি খাতের সুবিধা পেয়েছেন। এসব প্রকল্পের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ড্রিম মাশরুম ভ্যালির মালিক বাবুল বলেন,
“৮–৯ লাখ টাকার বিভিন্ন বিল আসে, সেগুলো উত্তোলন করেছি।”
তবে সম্পদের মোট পরিমাণ, আয়-ব্যয়ের হিসাব কিংবা প্রশিক্ষকের অনুমোদিত তালিকা সংক্রান্ত কোনো লিখিত নথি তিনি দেখাতে পারেননি।
প্রশিক্ষণার্থীরা জানান, প্রত্যেকে ১১ হাজার টাকা করে ভাতা পেয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ের ব্যয়, প্রশিক্ষণের মান এবং ঘোষিত বরাদ্দের সঙ্গে বাস্তব সুবিধার বড় ধরনের গরমিল রয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন,
“প্রকল্পটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। যেকোনো অভিযোগ সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখে। ৬৪ জেলায় প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ৭৬০ কোটি টাকা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কারও হঠাৎ বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অর্থ আদায়, মানহীন উপকরণ, প্রশিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং উপজেলা বৈষম্যের অভিযোগ প্রকল্পের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সংবাদ প্রকাশের পর দুদকের অভিযান জনমনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। মাগুরাবাসীর প্রত্যাশা, পার্টনার–ডিএএম প্রকল্পের ব্যয়, বাবুলের সম্পদের উৎস এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটিত হবে এবং সরকারি অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

Reporter Name 


















