
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার আলোচিত এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে শুরু হয়েছে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান। জঙ্গল সলিমপুর অভিযান ঘিরে দেড় হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অংশ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা এই চট্টগ্রাম যৌথ বাহিনীর অভিযানে অংশ নিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
রবিবার (৮ মার্চ) দিবাগত গভীর রাতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে অভিযানটি শুরু হয়। ভোর হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকার সব গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর সোমবার ভোর থেকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, এই জঙ্গল সলিমপুর অভিযান পরিচালনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের নেতৃত্বাধীন অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি ও জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত চিহ্নিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা।
দেড় হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনী
অভিযানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) প্রায় ৮০০ সদস্য এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের প্রায় ৭০০ সদস্য অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও র্যাব ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
রাত প্রায় চারটার দিকে নগরীর আগ্রাবাদ ছোটপুল পুলিশ লাইন্স থেকে বড় বহর নিয়ে পুলিশ সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। একই সময় বিভিন্ন স্থান থেকে যৌথ বাহিনীর অন্য সদস্যরাও এলাকায় অবস্থান নেন। এরপর পুরো এলাকাকে ঘিরে শুরু হয় সমন্বিত অভিযান।
টার্গেটে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ এবং রিদোয়ান গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত।
এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইয়াসিন গ্রুপকে এলাকাটির সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রাম যৌথ বাহিনীর অভিযানে এসব গ্রুপের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ হিসেবে পরিচিত এলাকা
চট্টগ্রাম নগরীর কাছাকাছি হলেও জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি কঠিন এলাকা হিসেবে পরিচিত। অনেকেই এলাকাটিকে ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ বলে উল্লেখ করেন।
বায়েজিদ লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রায় এক থেকে দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে সেখানে।
অপরিকল্পিত বসতি, সরু রাস্তা এবং দুর্গম পাহাড়ি পথের কারণে অতীতে এখানে নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় আকারের জঙ্গল সলিমপুর অভিযান শুরু করা হয়েছে।
র্যাবের ওপর হামলার ঘটনার পর অভিযান
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাব সদস্যরা হামলার মুখে পড়েন। লাঠিসোঁটা হাতে কয়েকশ মানুষ র্যাবের গাড়িতে হামলা চালায় এবং গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলিও চালানো হয়। একপর্যায়ে হামলাকারীরা কয়েকজন র্যাব সদস্যকে মারধর করে এবং তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়।
ওই ঘটনায় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং আরও কয়েকজন সদস্য আহত হন। ঘটনার পর থেকে এলাকাটিতে সন্ত্রাসী দমনে বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলমান চট্টগ্রাম যৌথ বাহিনীর অভিযান সফল হলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Reporter Name 


















