গাজীপুর , মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ খবর :
নিয়ামতপুরে দুর্যোগ সহায়তা: ঢেউটিন ও অনুদান বিতরণ কালিহাতীতে বাস-সিএনজি দুর্ঘটনায় বৃদ্ধার মৃত্যু, শোক টাঙ্গাইলে চট্টগ্রামে ব্যাংক বিক্ষোভ: ৫ ব্যাংকের শাখায় তালা, গ্রাহকদের উত্তেজনা তেঁতুলিয়ায় চুরি গরু উদ্ধার, আটক ইউপি সদস্যের ভাই পূবাইল চাঞ্চল্যকর ঘটনা: চাচিকে নিয়ে ভাতিজা উধাও, এলাকায় তোলপাড় মসজিদে সেজদায় বৃদ্ধ মুসল্লি খুন, শ্রীমঙ্গলে ঘাতক আটক রাঙ্গামাটিতে ছাত্রদল কমিটি বাতিলের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ঢাকা প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন ও কর্মসূচি ঘোষণা নগরকান্দায় স্বর্ণালংকার চুরি: সালিস নিয়ে অপপ্রচার হবিগঞ্জে গণমাধ্যম দিবসে র‍্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
ভোটের হাওয়া

লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের ওপর নির্যাতন: আশরাফ-বাহার চক্রের অভিযোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
  • ৪৭ Time View

কুমিল্লা প্রতিনিধি 

লিবিয়ায় চার শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিকের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। প্রবাসে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অসহায় তরুণদের মানবপাচারের মাধ্যমে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে জিম্মি করে নির্যাতনের ঘটনাকে মানবাধিকারকর্মীরা “ভয়াবহ ও লজ্জাজনক” বলে অভিহিত করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লার আশরাফ ও তার ভাই বাহারের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই মানবপাচার কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তারা ইউরোপে বৈধভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণদের সংগ্রহ করে। মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে তাদের প্রথমে কয়েকটি দেশে পাঠানো হয়, পরে অবৈধ পথে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

পাসপোর্ট জব্দ, জিম্মি করে নির্যাতন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ‘গেম ঘর’ নামে পরিচিত নির্যাতনকেন্দ্রে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে মুক্তিপণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়।

একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, আশরাফ ও বাহারের নির্দেশেই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। নির্যাতনের ভয়ে অনেকে পরিবারকে সবকিছু খুলে বলতে পারেননি। কেউ কেউ ধার-দেনা করে টাকা পাঠিয়েও মুক্তি পাননি—বরং আরও অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নারী সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা

অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, আশরাফের দুই স্ত্রী—মাদারীপুরের রুনা ও বরিশালের সিমু—এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। তারা দেশে অবস্থান করে সম্ভাব্য প্রবাসপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রলোভন ছড়ান এবং অর্থ লেনদেনের সমন্বয় করেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে। লিবিয়ায় চলমান অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধচক্রগুলো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের টার্গেট করছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

তারা আরও জানান, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানবপাচার রোধে কঠোর নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে লিবিয়ায় আটক বাংলাদেশিদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার করার দাবি জানানো হয়েছে।

প্রশাসনের অবস্থান

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, অভিযুক্ত ‘আশরাফ-বাহার চক্র’ বহু বছর ধরে গোপনে সক্রিয় ছিল এবং আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে। অসহায় মানুষের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

নিয়ামতপুরে দুর্যোগ সহায়তা: ঢেউটিন ও অনুদান বিতরণ

লিবিয়ায় বাংলাদেশিদের ওপর নির্যাতন: আশরাফ-বাহার চক্রের অভিযোগ

Update Time : ০৫:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

কুমিল্লা প্রতিনিধি 

লিবিয়ায় চার শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিকের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। প্রবাসে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অসহায় তরুণদের মানবপাচারের মাধ্যমে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে জিম্মি করে নির্যাতনের ঘটনাকে মানবাধিকারকর্মীরা “ভয়াবহ ও লজ্জাজনক” বলে অভিহিত করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লার আশরাফ ও তার ভাই বাহারের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই মানবপাচার কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তারা ইউরোপে বৈধভাবে কাজের সুযোগ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তরুণদের সংগ্রহ করে। মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে তাদের প্রথমে কয়েকটি দেশে পাঠানো হয়, পরে অবৈধ পথে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

পাসপোর্ট জব্দ, জিম্মি করে নির্যাতন

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর ‘গেম ঘর’ নামে পরিচিত নির্যাতনকেন্দ্রে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে মুক্তিপণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করা হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়।

একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, আশরাফ ও বাহারের নির্দেশেই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। নির্যাতনের ভয়ে অনেকে পরিবারকে সবকিছু খুলে বলতে পারেননি। কেউ কেউ ধার-দেনা করে টাকা পাঠিয়েও মুক্তি পাননি—বরং আরও অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নারী সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা

অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, আশরাফের দুই স্ত্রী—মাদারীপুরের রুনা ও বরিশালের সিমু—এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। তারা দেশে অবস্থান করে সম্ভাব্য প্রবাসপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রলোভন ছড়ান এবং অর্থ লেনদেনের সমন্বয় করেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে। লিবিয়ায় চলমান অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধচক্রগুলো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের টার্গেট করছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধারে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

তারা আরও জানান, বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানবপাচার রোধে কঠোর নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে লিবিয়ায় আটক বাংলাদেশিদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার করার দাবি জানানো হয়েছে।

প্রশাসনের অবস্থান

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, অভিযুক্ত ‘আশরাফ-বাহার চক্র’ বহু বছর ধরে গোপনে সক্রিয় ছিল এবং আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অপরাধ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে। অসহায় মানুষের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি।