
রাব্বির হোসেন রবিন, গাজীপুর প্রতিনিধি
গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানায় একটি অফিস ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে। প্রথমে এটি রাজনৈতিক হামলা হিসেবে প্রচার করা হলেও পরে বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনাটি পরিকল্পিত হতে পারে। এ ঘটনায় গাছা থানা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ শাহীনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গাছা থানা এলাকায় শাহীনের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই সময় শাহীন দাবি করেন, তার দলীয় কার্যালয়ে প্রতিপক্ষ হামলা চালিয়েছে এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং এলাকার বাসিন্দাদের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।
এই গাজীপুরে অফিস ভাঙচুর ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কিছু অস্বাভাবিক তথ্য পেয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, শাহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এলাকায় নিজের প্রভাব বাড়াতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করছেন।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, শাহীন এলাকায় ঝুট ব্যবসা, ডিশ সংযোগ ও ময়লা ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। এসব ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় বিরোধে জড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গাছা থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাঈম বলেন, বর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংগঠনকে শক্তিশালী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য কাজ করছেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন। তিনি বলেন, “অফিস ভাঙচুরের ঘটনাটি নিয়ে যে প্রচারণা চলছে, সেটি অনেকটাই সাজানো মনে হচ্ছে। নিজের অফিস নিজেই ভাঙচুর করে অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগ আমরা পেয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে মহানগর বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং প্রয়োজনে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে শাহীনের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
গাছা থানার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, শাহীন এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন। তিনি বহিরাগত হিসেবে এখানে এসে রাজনীতি করছেন। তার আচরণের কারণে এলাকায় প্রায়ই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একাধিকবার বিরোধের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে ছাত্রদলের নেতারাও শাহীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। গাছা থানাধীন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মিরাজ বলেন, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে শাহীন অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, “আমাদের ওপর আওয়ামী লীগের ট্যাগ লাগিয়ে মামলা দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমরা দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।”
মিরাজ আরও বলেন, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বিভিন্ন নাটক সাজানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দলীয় শীর্ষ নেতাদের ছবি নিজে ভেঙে সেটি অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনার সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগও সামনে এসেছে। এমারত হোসেন নামে এক ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ করেছে, তাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ে ফাঁসানো হয়েছে।
এমারতের স্ত্রী লাবনী জানান, তার স্বামীর কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমার স্বামী কোনোদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেননি। বরং তার কাছে বিএনপির সদস্য কার্ড আছে। কিন্তু চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে আওয়ামী লীগ সাজিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে যে মামলা দেওয়া হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এতে পরিবারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি উঠেছে আতাউর রহমান নামের এক অসুস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে। তিনি গুরুতর অসুস্থ এবং তার দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে বলে পরিবার জানিয়েছে। বর্তমানে তিনি মৃত্যুশয্যায় রয়েছেন। অথচ সেই মামলায় তাকেও আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও কিছু অসঙ্গতি দেখা গেছে। গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তিনি ঘটনাস্থলে প্রথম দিন গিয়ে কিছু ভাঙা চেয়ার-টেবিল দেখেছিলেন। তবে তখন কোনো নেতার ছবি ভাঙা অবস্থায় দেখেননি।
তিনি বলেন, “পরের দিন আবার গেলে দেখি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানসহ কয়েকজন নেতার ছবি ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। প্রথম দিন সেখানে কোনো ছবি ছিল না। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।”
এই বিএনপি নেতা শাহীনকে ঘিরে আরও একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ও ছবিকে কেন্দ্র করে। সেখানে দেখা যায়, তিনি অতীতে আওয়ামী লীগের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের গাজীপুর-২ আসনের সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জাহিদ আহসান রাসেলের পক্ষে একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির তালিকায় তার নাম ছিল বলেও একটি পত্র সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এসব তথ্য সামনে আসার পর স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, ঘটনাটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহীনের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি বর্তমানে এলাকার বাইরে আছেন। পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঘটনাটি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত স্বার্থে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্থানীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে দলগুলোর ভেতরেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করলে এ ধরনের বিতর্কের অবসান সম্ভব।
বর্তমানে গাজীপুরের এই অফিস ভাঙচুরের ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা সামনে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Reporter Name 


















