
ফয়সাল রহমান জনি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় নির্মাণাধীন একটি এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড) সড়ক নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৮১ লাখ টাকার প্রকল্পে নিম্নমানের ইট, কাদাযুক্ত বালু এবং যথাযথ কম্প্যাকশন ছাড়াই দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, সাঘাটা উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের সামির উদ্দিনের বাড়ি থেকে আলাই নদী পর্যন্ত ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের একটি হেরিং বোন রোড নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৪৮ টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের গুণগত মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ায় রাস্তা নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার বেড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে মাটি কম্প্যাকশন করা হয়নি। স্থানীয় নদী থেকে উত্তোলন করা কাদাযুক্ত বালু ব্যবহার করে দ্রুত ইট বসানো হচ্ছে। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ কাজের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে না পারেন।
স্থানীয় যুবক সাকিব আল হাসান অভিযোগ করে বলেন, ভেকু দিয়ে রাস্তার মাটি কাটার পর সেটি সমান না করেই বালু ফেলা হয়েছে। অনেক জায়গায় ইট ফাঁকা ফাঁকা করে বসানো হয়েছে। দ্রুত বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় কাজের মান বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার দাবি, এভাবে নির্মাণ করা হলে এক বছরের মধ্যেই রাস্তা ধসে পড়বে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাজু মিয়া বলেন, এলাকার মানুষ নতুন রাস্তার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু এখন যে ধরনের কাজ হচ্ছে, তাতে মানুষ হতাশ। স্থানীয়দের আপত্তি সত্ত্বেও কাজের ধরণ পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সবজি বিক্রেতা ছায়দার রহমান জানান, রাস্তা আগের চেয়েও নিচু করে নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ এটি আরও উঁচু করার কথা ছিল। তিনি বলেন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার ইট খুলে যেতে পারে।
কলেজ শিক্ষার্থী কাদের আলী বলেন, সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। কিন্তু কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দ্রুত তদন্তের দাবি জানান।
স্থানীয় কৃষিশ্রমিক আব্দুর রহমানের অভিযোগ, নির্মাণকাজে স্থানীয় শ্রমিকদের সুযোগ দেওয়া হয়নি। বাইরের শ্রমিক এনে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, খুব ভোরে কাজ শুরু করা হয় এবং দ্রুত বালু দিয়ে ইট ঢেকে ফেলা হয়, যাতে কেউ কাজের ত্রুটি বুঝতে না পারে।
এদিকে, সাঘাটা উপজেলার এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেন।
কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খন্দকার বলেন, তিনি একাধিকবার ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজের মান বজায় রাখার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার দাবি, রাস্তার বেড কাটার পর যথাযথ আর্দ্রতা পরীক্ষা ও কম্প্যাকশন করার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
নির্মাণকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কাসেম ট্রেডার্সের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার মো. রেজাইল গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি রাস্তার ভিডিও ধারণ করে প্রশাসনকে দেখানোর পরামর্শ দেন।
পিআইও অফিসের কার্যসহকারী আপেল মাহমুদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর কিছু নিম্নমানের ইট সরিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, স্থানীয়দের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান মোবাইল ফোনে অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পে কম্প্যাকশন করার জন্য রোলার ব্যবহারের বরাদ্দ আছে কি না তা যাচাই করতে হবে।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবির জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে বালু ভরাট, ইটের সোলিং, হেরিং বোন বন্ড, শ্রমিক ব্যয়, ড্রাম শিট, বাঁশের খুঁটি ও ঘাস লাগানোর জন্য পৃথক বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তব কাজের সঙ্গে বরাদ্দের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিম্নমানের এই নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

Reporter Name 

















