
গাজীপুর প্রতিনিধ:
গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ অফিস এলাকাকে ঘিরে আবারও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে বনভূমি দখল, প্রভাব বিস্তার এবং দালালির অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় সরকারি বনভূমিতে দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গাজীপুরের বাদিয়ারচালা গ্রামের বাসিন্দা মৃত আহসান উদ্দিনের ছেলে ইসমাইল হোসেন লাল মিয়া (৫৫)। স্থানীয়দের দাবি, তিনি রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ এলাকার বিভিন্ন বনভূমি সংক্রান্ত কাজে মধ্যস্থতা ও প্রভাব বিস্তার করে আসছেন দীর্ঘ সময় ধরে। এর ফলে বনভূমি রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের আওতাধীন ৫৯ নম্বর নোয়াগাঁও মৌজার সি.এস./এস.এ. দাগ নং ৩০ এবং আর.এস. দাগ নং ১১০-এর গেজেটভুক্ত বনভূমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কার্যক্রমে তার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বনভূমি সংক্রান্ত কাজে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে তিনি অবৈধ সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন এবং অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, রাজেন্দ্রপুর জনকল্যাণ বাজার এলাকায় গড়ে ওঠা একাধিক ইটের দোকান, স্থাপনা এবং ব্যবসা পরিচালনার পেছনেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। বনভূমির জায়গায় এসব স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মচারীর সহযোগিতায় রাতের আঁধারে স্থাপনা নির্মাণ এবং জমি দখলের ঘটনা ঘটছে। তাদের দাবি, গত ৮ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে এমনই একটি ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিটের দুই বনরক্ষী খাজা ও মাফুজের সহায়তায় দ্রুত সময়ে একটি স্থাপনা নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনভূমি দখল ও অবৈধ কার্যক্রমে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা বন বিভাগের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির নীরব সহযোগিতায় এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে সরকারি বনভূমি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।
এদিকে বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, নোয়াগাঁও গ্রামের রিপনের সঙ্গে একটি আর্থিক লেনদেন ও সমঝোতার ঘটনায়ও লাল মিয়ার নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বয়লার মুরগির দোকান স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয়দের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদাসীনতা এবং নীরব ভূমিকা। তাদের মতে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল ও অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছে। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সরকারি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।
অভিযুক্ত ইসমাইল হোসেন লাল মিয়ার বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ অফিসার জুয়েল রানা বলেন, “লাল মিয়া দলীয় প্রভাব খাটিয়ে রাতের আঁধারে ঘর নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ অফিস এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং বনসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করেন, একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা জরুরি। একইসঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বনভূমি আরও সংকটের মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বনভূমি দখল রোধে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বন সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জ অফিসকে ঘিরে উঠা বনভূমি দখল অভিযোগ এখন গাজীপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে প্রকৃত সত্য উন্মোচন হবে কি না।

Reporter Name 









