গাজীপুর , রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ খবর :
ভোটের হাওয়া
পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ নির্বাচন: প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমঅধিকার দাবি কালিয়াকৈরে মানবিক নেতা সাইজুদ্দিন আহমেদ কালিয়াকৈর পৌরসভা: দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত উদ্যোগে জসিম উদ্দিন চট্টগ্রামে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মিদের খুঁজছে পুলিশ গাজীপুরে ঝুট ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা, লুটপাট ও ককটেল সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় নাসরিন রহমান পপি শহরের মতো গ্রাম গড়ার অঙ্গীকার আলা উদ্দিনের শ্রীপুরে মাওনা–উজিলাব সড়ক উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন নকলায় এমপির সাথে এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষক নেতাদের সাক্ষাৎ চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৪ এপ্রিল

চবক’ চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
  • ৬৪ Time View

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে ঘিরে যে কোনো অনুসন্ধান কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ দাখিল করেছে। অভিযোগের দুটি ভিত্তি সামনে এসেছে—বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে জাহাজ ক্রয়ে অনিয়ম এবং কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং–সংক্রান্ত দুর্নীতি। তবে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও সময়রেখা বিশ্লেষণে অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসসি-তে জাহাজ ক্রয়ের সময় অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এস এম মনিরুজ্জামান বিএসসি থেকে দায়িত্ব ছাড়ার পর। ফলে যে সময়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রশাসনিক নীতিমালায় সাধারণত দায়িত্ব যার, জবাবদিহিও তার—এমন নীতির কথাই উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং–সংক্রান্ত যে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটি ২০১৯ সালের ঘটনা বলে জানা গেছে। অথচ এস এম মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। পাঁচ বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবনে এস এম মনিরুজ্জামান সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে আগে কখনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার সময় জাতীয় অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বন্দর কার্যক্রম কিছুটা ঝুঁকির মুখে ছিল। পরবর্তীতে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হয় বলে বন্দর সূত্র জানিয়েছে। জাহাজের গড় অপেক্ষার সময়ও কমে আসে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে নতুন রেকর্ড গড়ে। এ সময়ে রাজস্ব আয় দাঁড়ায় ৫ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং উদ্বৃত্ত হয় ২ হাজার ৯১২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বন্দরের লাভ হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে সরকারের কোষাগারে ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে জমা হয়েছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ই-বিলিং, অনলাইন পেমেন্ট ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়মে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তবে অতীতে বিভিন্ন মামলার কারণে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে দুদককে আরও স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে সময়রেখা ও দায়িত্বকাল যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি বলেও তারা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি চট্টগ্রাম বন্দর। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কোনো অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

চবক’ চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক

Update Time : ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে ঘিরে যে কোনো অনুসন্ধান কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং তা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগ দাখিল করেছে। অভিযোগের দুটি ভিত্তি সামনে এসেছে—বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে জাহাজ ক্রয়ে অনিয়ম এবং কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং–সংক্রান্ত দুর্নীতি। তবে সংশ্লিষ্ট তথ্য ও সময়রেখা বিশ্লেষণে অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসসি-তে জাহাজ ক্রয়ের সময় অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এস এম মনিরুজ্জামান বিএসসি থেকে দায়িত্ব ছাড়ার পর। ফলে যে সময়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রশাসনিক নীতিমালায় সাধারণত দায়িত্ব যার, জবাবদিহিও তার—এমন নীতির কথাই উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং–সংক্রান্ত যে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটি ২০১৯ সালের ঘটনা বলে জানা গেছে। অথচ এস এম মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। পাঁচ বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে দীর্ঘ কর্মজীবনে এস এম মনিরুজ্জামান সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে আগে কখনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার সময় জাতীয় অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বন্দর কার্যক্রম কিছুটা ঝুঁকির মুখে ছিল। পরবর্তীতে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হয় বলে বন্দর সূত্র জানিয়েছে। জাহাজের গড় অপেক্ষার সময়ও কমে আসে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে নতুন রেকর্ড গড়ে। এ সময়ে রাজস্ব আয় দাঁড়ায় ৫ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং উদ্বৃত্ত হয় ২ হাজার ৯১২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বন্দরের লাভ হয়েছে ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে সরকারের কোষাগারে ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে জমা হয়েছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ই-বিলিং, অনলাইন পেমেন্ট ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়মে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তবে অতীতে বিভিন্ন মামলার কারণে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে দুদককে আরও স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে সময়রেখা ও দায়িত্বকাল যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি বলেও তারা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি চট্টগ্রাম বন্দর। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কোনো অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।