গাজীপুর , সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ খবর :
সোনাপুর ইউনিয়ন মেম্বার প্রার্থী ছাব্বির হোসেনের উন্নয়ন ও প্রতিশ্রুতি নওগাঁয় ব্র্যাক প্রাইজ প্রকল্পের কারিগরি প্রশিক্ষণ সনদ বিতরণ ব্র্যাকের প্রশিক্ষণে দুধ উৎপাদন ও গাভী পালনে দক্ষতা বৃদ্ধি ধনবাড়ীতে ৫ বছরে ১২ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠিত কালিয়াকৈরে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু: নলুয়া এলাকায় হৃদয়বিদারক ঘটনা নাসিরনগরে অটোরিকশা চার্জ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে চালকের মৃ/ত্যু ঢাকা ডিসি অফিস পিয়ন ফিরোজ: চাঁদাবাজি-জমি দখল তদন্ত শুরু কালিয়াকৈরে প্রিপেইড মিটার সমস্যায় পল্লী বিদ্যুৎ ভোগান্তি চরমে গণরায় বাস্তবায়ন ও চট্টগ্রাম সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমানের কঠোর বার্তা বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশের সিভিল টিমের চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন

তেলিপাড়ায় বাল্যবিবাহ ও কাজী অফিসে অনিয়ম

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
  • ৮৯ Time View

গাজীপুর প্রতিনিধি

গাজীপুর জেলার তেলিপাড়া ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বাল্যবিবাহ, অনিয়মিত বিয়ে রেজিস্ট্রি এবং একাধিক কাজী অফিস পরিচালনার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় কাজী এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই এসব অভিযোগ থাকলেও সম্প্রতি বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হুমকির মুখে পড়তে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে একদল সংবাদকর্মী সরেজমিনে তেলিপাড়ায় যান। প্রথমে কাজী এরশাদের মূল অফিসে উপস্থিত হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তারা পাশের আরেকটি অফিসে যান, যা স্থানীয়ভাবে কাজী এরশাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মোবাইল ফোনে কাজী এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ফোনালাপে বাল্যবিবাহ এবং একাধিক অফিস পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কাজী প্রথমে এড়িয়ে যান। প্রশ্নের চাপ বাড়লে তিনি উত্তেজিত হয়ে এক পর্যায়ে সাংবাদিক হাসানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন। এতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরে ভুক্তভোগী সাংবাদিক হাসান বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি নং ১২৪) করেছেন।

ঘটনার মধ্যেই উঠে আসে আরও একটি হৃদয়বিদারক তথ্য। কয়েকদিন আগে একই এলাকায় সুমাইয়া আক্তার সান্তনা নামের এক তরুণী বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিবারের দাবি, অল্প বয়সে বিয়ে, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক অশান্তির কারণে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয়দের মতে, এই বিয়েটিও তেলিপাড়ার একটি কাজী অফিসের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল, যদিও কোন অফিসে সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

অনুসন্ধান চলাকালীন জানা গেছে, একই ব্যক্তির প্রভাবের কারণে একাধিক কাজী অফিস পরিচালিত হচ্ছে। আইনগতভাবে একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য অনুমোদিত কাজীর বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করা বেআইনি। তবে তেলিপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম চলমান। স্থানীয়রা বলছেন, “এখানে বাল্যবিবাহ একটি ‘ওপেন সিক্রেট’। প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এই অপরাধকে বারবার সংঘটিত করার সুযোগ দেয়।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় এই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ নেই বলেই হতাশা প্রকাশ করছেন সচেতন মহল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের নীরবতা বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করছে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নও এই ঘটনার মাধ্যমে নতুনভাবে সামনে এসেছে। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং কাজের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। সাংবাদিক নেতারা দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগ, তদন্ত ও হুমকির ঘটনা একত্রে দেখায় যে, গাজীপুরের তেলিপাড়ার অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন, যেখানে বাল্যবিবাহ, অনিয়মিত রেজিস্ট্রি এবং একাধিক কাজী অফিসের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

সচেতন মহল ও সাংবাদিকরা প্রশাসনের কাছে দাবী করছেন, অবিলম্বে কঠোর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। পাশাপাশি, কাজী অফিসগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একাধিক অফিস পরিচালনার মতো নিয়মবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

এই ঘটনায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন বাসন থানায় ২ এপ্রিল একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি নং ১২৪) করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের কাছে আশা করা হচ্ছে, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তেলিপাড়ার ঘটনার আলোকচিত্র শুধু স্থানীয় নয়, বরং দেশের অনেক অঞ্চলে অনিয়ম ও বাল্যবিবাহের সমস্যার একটি নজির হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই প্রশাসন, সমাজ ও গণমাধ্যম একযোগে সচেতন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

গাজীপুরের কাজীদের বাল্যবিবাহ সিন্ডিকেট, একাধিক অফিস পরিচালনা এবং সাংবাদিক হুমকির ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনা নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের প্রতিবেদনে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

সোনাপুর ইউনিয়ন মেম্বার প্রার্থী ছাব্বির হোসেনের উন্নয়ন ও প্রতিশ্রুতি

তেলিপাড়ায় বাল্যবিবাহ ও কাজী অফিসে অনিয়ম

Update Time : ০৩:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

গাজীপুর প্রতিনিধি

গাজীপুর জেলার তেলিপাড়া ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে বাল্যবিবাহ, অনিয়মিত বিয়ে রেজিস্ট্রি এবং একাধিক কাজী অফিস পরিচালনার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় কাজী এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই এসব অভিযোগ থাকলেও সম্প্রতি বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হুমকির মুখে পড়তে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে একদল সংবাদকর্মী সরেজমিনে তেলিপাড়ায় যান। প্রথমে কাজী এরশাদের মূল অফিসে উপস্থিত হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তারা পাশের আরেকটি অফিসে যান, যা স্থানীয়ভাবে কাজী এরশাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মোবাইল ফোনে কাজী এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ফোনালাপে বাল্যবিবাহ এবং একাধিক অফিস পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কাজী প্রথমে এড়িয়ে যান। প্রশ্নের চাপ বাড়লে তিনি উত্তেজিত হয়ে এক পর্যায়ে সাংবাদিক হাসানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন। এতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরে ভুক্তভোগী সাংবাদিক হাসান বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি নং ১২৪) করেছেন।

ঘটনার মধ্যেই উঠে আসে আরও একটি হৃদয়বিদারক তথ্য। কয়েকদিন আগে একই এলাকায় সুমাইয়া আক্তার সান্তনা নামের এক তরুণী বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরিবারের দাবি, অল্প বয়সে বিয়ে, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক অশান্তির কারণে তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয়দের মতে, এই বিয়েটিও তেলিপাড়ার একটি কাজী অফিসের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল, যদিও কোন অফিসে সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

অনুসন্ধান চলাকালীন জানা গেছে, একই ব্যক্তির প্রভাবের কারণে একাধিক কাজী অফিস পরিচালিত হচ্ছে। আইনগতভাবে একটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য অনুমোদিত কাজীর বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করা বেআইনি। তবে তেলিপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম চলমান। স্থানীয়রা বলছেন, “এখানে বাল্যবিবাহ একটি ‘ওপেন সিক্রেট’। প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এই অপরাধকে বারবার সংঘটিত করার সুযোগ দেয়।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় এই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ নেই বলেই হতাশা প্রকাশ করছেন সচেতন মহল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের নীরবতা বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করছে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার প্রশ্নও এই ঘটনার মাধ্যমে নতুনভাবে সামনে এসেছে। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং কাজের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। সাংবাদিক নেতারা দ্রুত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগ, তদন্ত ও হুমকির ঘটনা একত্রে দেখায় যে, গাজীপুরের তেলিপাড়ার অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন, যেখানে বাল্যবিবাহ, অনিয়মিত রেজিস্ট্রি এবং একাধিক কাজী অফিসের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

সচেতন মহল ও সাংবাদিকরা প্রশাসনের কাছে দাবী করছেন, অবিলম্বে কঠোর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। পাশাপাশি, কাজী অফিসগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একাধিক অফিস পরিচালনার মতো নিয়মবিরুদ্ধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

এই ঘটনায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন বাসন থানায় ২ এপ্রিল একটি সাধারণ ডায়রি (জিডি নং ১২৪) করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের কাছে আশা করা হচ্ছে, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তেলিপাড়ার ঘটনার আলোকচিত্র শুধু স্থানীয় নয়, বরং দেশের অনেক অঞ্চলে অনিয়ম ও বাল্যবিবাহের সমস্যার একটি নজির হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই প্রশাসন, সমাজ ও গণমাধ্যম একযোগে সচেতন হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

গাজীপুরের কাজীদের বাল্যবিবাহ সিন্ডিকেট, একাধিক অফিস পরিচালনা এবং সাংবাদিক হুমকির ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনা নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের প্রতিবেদনে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে।