
চট্টগ্রামে ঈদের আনন্দ মানেই ঘরভর্তি অতিথি আর নানা ধরনের খাবারের আয়োজন। এই শহরের মানুষের কাছে ঈদের দিন শুধু নামাজ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এক বিশেষ উপলক্ষ। আর এই আয়োজনের বড় অংশজুড়ে থাকে ঈদের নাস্তা, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে সেমাই।
ঈদের সকাল শুরু হয় নানা ধরনের মুখরোচক খাবার দিয়ে। সাধারণত টেবিলে থাকে সেমাই, শাহী টুকরা, ফিরনি, জর্দা, পরোটা, গরু বা মুরগির ভুনা, পুরি-আলুর দম, ডিম ভাজি, চিকেন ফ্রাই, শামী কাবাব, স্যান্ডউইচ, নুডলস বা পাস্তা, ছোলা ভাজা, খেজুর, ফলের সালাদ, দই, জুস এবং চা বা কফি। তবে এত আয়োজনের মাঝেও সবার নজর থাকে সেমাইয়ের দিকে। কারণ এটি শুধু একটি খাবার নয়, বরং ঈদের ঐতিহ্যের অংশ।
চট্টগ্রামে সেমাইয়ের জনপ্রিয়তা এখনো আগের মতোই রয়েছে। বিশেষ করে দুই ধরনের সেমাই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—লাচ্ছা সেমাই এবং চিকন (বাংলা) সেমাই। লাচ্ছা সেমাই সাধারণত আগে থেকেই ঘিয়ে ভাজা থাকে। তাই এটি রান্না করা সহজ এবং কম সময় লাগে। শুধু দুধ, চিনি, বাদাম ও কিশমিশ দিয়ে দ্রুত প্রস্তুত করা যায়। অন্যদিকে চিকন সেমাই রান্নার আগে হালকা করে ভেজে নিতে হয়, তারপর দুধ দিয়ে রান্না করতে হয়। এতে একটু সময় বেশি লাগে, তবে স্বাদে আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
বর্তমানে বাজারে লাচ্ছা সেমাইয়ের চাহিদা বেশি দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হলো সহজ প্রস্তুত প্রণালী। ব্যস্ত জীবনে মানুষ এখন দ্রুত রান্না করা যায় এমন খাবারের দিকে ঝুঁকছে। ফলে চিকন সেমাইয়ের চাহিদা কিছুটা কমেছে।
একসময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় হাতে তৈরি খোলা সেমাইয়ের বেশ কদর ছিল। বিশেষ করে চাক্তাই এলাকায় বহু সেমাই কারখানা ছিল। তবে এখন সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বর্তমানে সেখানে ১৫ থেকে ২০টির মতো কারখানা চালু রয়েছে। এছাড়া বাকলিয়া, রাজাখালী, খাতুনগঞ্জ ও মাদারবাড়ি এলাকায় এখনো কিছু কারখানায় সেমাই তৈরি হয়।
বাজারে সেমাইয়ের দামের ক্ষেত্রেও তেমন বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ২০০ গ্রাম প্যাকেটজাত লাচ্ছা বা চিকন সেমাই সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঘি ও কিশমিশযুক্ত প্যাকেটের দাম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। খোলা চিকন সেমাই প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং লাচ্ছা সেমাই প্রায় ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। উন্নতমানের ব্র্যান্ডেড প্যাকেটের দাম ২৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন সেমাইয়ের চাহিদা কিছুটা কমেছে। আগে বড় পরিবারগুলো একসঙ্গে কয়েক কেজি সেমাই কিনত। এখন ছোট পরিবার এবং আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে সেই প্রবণতা কমে গেছে। নতুন নতুন খাবারের সংযোজনও সেমাইয়ের চাহিদায় প্রভাব ফেলছে।
তারপরও বলা যায়, ঈদের দিনে চট্টগ্রামে সেমাই এখনো একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহ্য, সহজ প্রস্তুত প্রণালী এবং সুস্বাদের কারণে এটি এখনো সবার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বিশেষ করে লাচ্ছা সেমাই দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে, সময়ের পরিবর্তন এলেও ঈদের নাস্তায় সেমাইয়ের গুরুত্ব এখনো অটুট রয়েছে।

Reporter Name 

















