
মোঃ নাজমুল হাসান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় পরিবেশ দূষণকারী একটি নতুন অবৈধ ইটভাটা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার কয়লা দিয়াড় গ্রামে ‘টপটেন ব্রিকস’ নামে ওই ইটভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইটভাটা নির্মাণ বন্ধ এবং এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এলাকাবাসী।
চলতি বছরের ২ জুন কয়লা দিয়াড় গ্রামের মো. তুষার আহমেদ এলাকাবাসীর পক্ষে এসব অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি ইটভাটাটি নির্মাণের বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কৃষিজমির পাশে ইটভাটা নির্মাণের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শিবগঞ্জ উপজেলার কয়লা দিয়াড় গ্রামে নতুন করে টপটেন ব্রিকস নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক সেনা সদস্য মো. সারোয়ার জাহানসহ কয়েকজন ব্যক্তি এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে কৃষিজমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ইটভাটা নির্মাণ করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ইটভাটা নির্মাণের জন্য এলাকার ফসলি জমির গাছ ও ফসল কেটে ফেলা হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়রা আরও জানান, কয়লা দিয়াড় এলাকায় আগে থেকেই কয়েকটি ইটভাটা নিয়ে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এসব ইটভাটা অপসারণের দাবিতে অতীতে আন্দোলন ও মানববন্ধনও করেছেন এলাকাবাসী। ওই সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হলেও পরে কিছু ভাটা আবার চালু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইটভাটার ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষণের অভিযোগ
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অবৈধ ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ভাটার আশপাশের কৃষিজমির ফসলেও এর প্রভাব পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ধান, পাট, আম ও বিভিন্ন সবজি চাষে ক্ষতির অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। অনেক ফসলের ওপর কালো আস্তরণ পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
ইটভাটার কারণে এলাকার কাঁচা ও পাকা সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টির সময় রাস্তায় জমে থাকা মাটি কাদায় পরিণত হয়ে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে স্থানীয়রা
ইটভাটার ধোঁয়া ও দূষিত পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইটভাটার কারণে শিশু, বয়স্ক ও সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখের সমস্যা এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। একই সঙ্গে কৃষিজমির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ইটভাটার কার্যক্রম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
হুমকির অভিযোগ
ইটভাটা নির্মাণের প্রতিবাদ করায় অভিযোগকারীদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে অভিযোগকারীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, ইটভাটাকে কেন্দ্র করে শিশুশ্রম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে অনেক শিশু পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়তে পারে বলেও তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অনুমোদন না পাওয়ার কথা জানালেন ইউএনও
এ বিষয়ে টপটেন ব্রিকসের পরিচালক ও সাবেক সেনা সদস্য সরওয়ার জাহান বলেন, আশপাশে যেসব ইটভাটা চলছে, সেগুলোর বিষয় বিবেচনা করেই তাঁরা ইটভাটা তৈরি করছেন। তিনি আরও বলেন, ইটভাটার অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, টপটেন নামে একটি নতুন ইটভাটা নির্মাণের বিষয়ে এলাকাবাসী আবেদন করেছেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জানা গেছে, ইটভাটা নির্মাণকারীদের এখনো কোনো অনুমোদন নেই।
ইউএনও বলেন, সংশ্লিষ্টরা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। অনুমোদন ছাড়া ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পরিবেশ অধিদপ্তরের
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবু সাঈদ বলেন, অবৈধ ইটভাটা নির্মাণের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শিবগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে কতটি ইটভাটা অনুমোদিত রয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
তদন্তের আশ্বাস জেলা প্রশাসকের
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, অবৈধভাবে ইটভাটা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, শুধু নতুন ইটভাটা নির্মাণ বন্ধ করলেই হবে না। এলাকায় আগে থেকে চালু থাকা অনুমোদনহীন ইটভাটাগুলোর বিষয়েও তদন্ত প্রয়োজন। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ইটভাটার বৈধতা যাচাই করা হবে। অনুমোদন না থাকলে দ্রুত নির্মাণকাজ বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
উল্লেখ্য, ইটভাটা নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রচলিত পরিবেশগত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো ইটভাটা পরিচালনা করা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

Reporter Name 



















