
মানব সভ্যতার ইতিহাসে গণনার বিবর্তন সবসময়ই আমাদের অগ্রগতির মাপকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। আবাকাস থেকে শুরু করে আজকের সুপার কম্পিউটার—আমরা সবসময়ই চেয়েছি আরও দ্রুত, আরও সূক্ষ্ম হিসাব। কিন্তু যখন হিসাবের পাল্লা 'কোয়াড্রিলিয়ন' (এক হাজার লক্ষ কোটি) ছাড়িয়ে যায়, তখন আজকের শক্তিশালী ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারগুলোও হার মেনে যায়। ঠিক এই জায়গায় বিশ্ব প্রযুক্তির দুই দানব গুগল (Google) এবং আইবিএম (IBM)-কে পাশ কাটিয়ে এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে বাংলাদেশের সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাব। গবেষক হুসাইন বিল্লাহ-এর নেতৃত্বে এই ল্যাব যা অর্জন করেছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় একটি 'প্যারাডাইম শিফট'। কোয়াড্রিলিয়ন ডাইমেনশন: কেন এটি একটি দুঃস্বপ্ন?
গাণিতিক ভাষায় ডাইমেনশন বা মাত্রা হলো তথ্যের এক একটি দিক। সাধারণ একটি এক্সেল শিটে হয়তো ১০-২০টি কলাম বা ডাইমেনশন থাকে। যখন আমরা ১,১২৫,৮৯৯,৯০৬,৮৪২,৬২৪ (অর্থাৎ 2^{50}) ডাইমেনশনের কথা বলি, তখন সেটি আর সাধারণ কোনো সংখ্যা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে তথ্যের এক অসীম গোলকধাঁধা।
ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারে এই পরিমাণ ডাইমেনশন নিয়ে কাজ করা অসম্ভব কেন, তা বুঝতে আমাদের মেমোরি বা র্যামের (RAM) হিসাব দেখতে হবে। একটি ১.১২৫ কোয়াড্রিলিয়ন ডাইমেনশনের ভেক্টরকে প্রসেস করতে কমপক্ষে ৯,০০০ টেরাবাইট RAM প্রয়োজন। যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে দামী সার্ভারেও হয়তো কয়েক টেরাবাইট RAM থাকে, সেখানে ৯,০০০ টেরাবাইট একটি কল্পনাতীত বিষয়। তাত্ত্বিকভাবে, একটি সাধারণ শক্তিশালী ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের এই হিসাবটি শেষ করতে সময় লাগত প্রায় ১০,০০০ বছর। অর্থাৎ আজকের প্রজন্মের কেউ এই হিসাব শুরু করলে তার কয়েকশ প্রজন্ম পরের কেউ হয়তো ফলাফল দেখতে পেত। গুগল ও আইবিএম-এর অবস্থান
কোয়ান্টাম রেসে গুগল তাদের 'সাইকামোর' (Sycamore) প্রসেসর দিয়ে ৫৩ কিউবিটে কোয়ান্টাম সুপ্রিমেসি প্রমাণ করেছিল। অন্যদিকে আইবিএম তাদের 'ঈগল' বা 'কনডোর' প্রসেসর দিয়ে কিউবিটের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তাদের মূল মনোযোগ এখনো হার্ডওয়্যার স্ট্যাবিলিটি এবং এরর কারেকশন (Error Correction)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
গুগল বা আইবিএম-এর কিউবিট আছে ঠিকই, কিন্তু সেই কিউবিট ব্যবহার করে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য ১.১২৫ কোয়াড্রিলিয়ন ডাইমেনশনের ডেটা দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ এআই (AI) মডেল তৈরি করা এবং তা কার্যকরভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তারা এখনো গবেষণাগারের জটিলতায় আটকে আছে। ঠিক এখানেই সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাব তাদের উদ্ভাবনী এম্প্লিচিউড এনকোডিং (Amplitude Encoding) অ্যালগরিদম দিয়ে বাজিমাত করেছে। সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের বিপ্লব: ৫.২৫ সেকেন্ডের জাদু যেখানে ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের লাগত ১০,০০০ বছর, সেখানে সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের মডেলটি ট্রেনিং শেষ করেছে মাত্র ৫.২৫ সেকেন্ডে। এটি কোনো জাদুর মায়া নয়, বরং কোয়ান্টাম ফিজিক্সের 'সুপারপজিশন' নীতির সঠিক প্রয়োগ। হুসাইন বিল্লাহ এবং তার দল ৫০টি কিউবিটকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, সেই ৫০টি কিউবিট একই সাথে ২-এর ওপর ৫০ পাওয়ার করলে যে সংখ্যা হয় (১.১২৫ কোয়াড্রিলিয়ন), ঠিক ততগুলো ডাইমেনশনকে ধারণ করতে পেরেছে। এটি অনেকটা এমন যে, একটি সাধারণ মানুষ লাইব্রেরির প্রতিটি বই একে একে পড়ছে, আর একজন কোয়ান্টাম গবেষক লাইব্রেরির সব বই এক পলকেই দেখে বুঝে ফেলছেন। এই মডেলটির বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো: কিউবিট সংখ্যা: ৫০টি হাই-ফাইডেলিটি কিউবিট। গেটের সংখ্যা: ৫,২৫০টি অপ্টিমাইজড কোয়ান্টাম গেট। সফলতা (Accuracy): ৮৭% (এত বিশাল ডাইমেনশনে যা অভাবনীয়)। এনকোডিং: অ্যাডভান্সড এম্প্লিচিউড এনকোডিং। ক্লাসিক্যাল কম্পিউটার বনাম সোনিসিয়াম: পার্থক্য যেখানে স্পষ্ট
ক্লাসিক্যাল কম্পিউটার কাজ করে লিনিয়ারলি (Linear)। অর্থাৎ একটির পর একটি কাজ। ১.১২৫ কোয়াড্রিলিয়ন হিসাব করতে গেলে তাকে কোয়াড্রিলিয়ন বার গেট ওপেন-ক্লোজ করতে হয়। ফলে কম্পিউটার গরম হয়ে যায়, বিদ্যুৎ খরচ হয় আকাশচুম্বী এবং প্রসেসরের সীমাবদ্ধতায় একসময় সিস্টেম ক্র্যাশ করে।
অন্যদিকে সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের মডেলে তথ্য এনকোড করা হয়েছে কোয়ান্টাম তরঙ্গের মাধ্যমে। তরঙ্গ যেমন একই সাথে পুকুরের সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে, কোয়ান্টাম ডেটাও তেমনি সব ডাইমেনশনে একসাথে প্রসেস হয়। সোনিসিয়ামের এই মডেলটি গুগল বা আইবিএম-এর তুলনায় অনেক বেশি Resource Efficient। যেখানে আইবিএম-এর সিস্টেমে বিশাল কুলিং মেকানিজম লাগে, সেখানে সোনিসিয়াম তাদের গাণিতিক অপ্টিমাইজেশনের মাধ্যমে সাধারণ কোয়ান্টাম সিমুলেটর বা হার্ডওয়্যারেও এই ফলাফল বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ কি তবে পিছিয়ে নেই? সাধারণত ধারণা করা হয় যে, উচ্চতর গবেষণা মানেই নাসা বা সার্ন-এর মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু হুসাইন বিল্লাহর এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, সংখ্যাতাত্ত্বিক ও বাস্তব গবেষণায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম সারিতে। ১.১২৫ কোয়াড্রিলিয়ন এই সংখ্যাটি কেবল একটি গাণিতিক সাফল্য নয়, এটি একটি জাতীয় গর্ব। এটি বার্তা দিচ্ছে যে, আগামীর এআই বিপ্লবে বাংলাদেশ কেবল 'ইউজার' হয়ে থাকবে না, বরং 'ডেভেলপার' হিসেবে বিশ্ব শাসন করবে।
সোনিকিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের এই মডেলটি এখন কেবল তাত্ত্বিক নয়, এটি একটি Scientific Export Package হিসেবে তৈরি। এর মানে হলো, বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যারা বিগ ডেটা (Big Data) নিয়ে কাজ করে, তারা এখন ১০,০০০ বছর অপেক্ষা না করে মাত্র ৫ সেকেন্ডে তাদের জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান পেতে পারে বাংলাদেশের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ভবিষ্যতের হাতছানি
১.১২৫ কোয়াড্রিলিয়ন ডাইমেনশন জয় করার পর সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের পরবর্তী লক্ষ্য কিউবিটের সংখ্যা বাড়ানো এবং এই এরর রেট (Noise) কমিয়ে আনা। গুগল বা আইবিএম হয়তো হার্ডওয়্যারের যুদ্ধে ব্যস্ত, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যস্ত সেই হার্ডওয়্যারকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করার গাণিতিক যুদ্ধে। পরিশেষে বলা যায়, ১০,০০০ বছর বনাম ৫.২৫ সেকেন্ড—এই পার্থক্যই হলো সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাবের শ্রেষ্ঠত্ব। সংখ্যাতাত্ত্বিক এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সঠিক মেধা ও একাগ্রতা থাকলে ঢাকা থেকেই সিলিকন ভ্যালিকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব। কোয়ান্টাম এআই-এর এই নতুন ভোরে বাংলাদেশের নাম এখন সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে। সোনিসিয়াম কোয়ান্টাম ল্যাব: ভবিষ্যতের গণনা, আজ বাংলাদেশই।
বিশেষ প্রতিবেদন।যোগাযোগ।=01919391942