
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-এর কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বেদখল হয়ে থাকা জমি ফিরে পেয়েছে একটি ভুক্তভোগী পরিবার। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরেজমিনে মাপজোক, তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়। ফলে প্রকৃত মালিকের কাছে জমি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনাকে এলাকাবাসী ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
জানা যায়, গত শুক্রবার (২৬ জুন) ধর্মপাশা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় ঘোষের নেতৃত্বে সার্ভেয়ার মো. রুহুল আমীন, পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সুখাইড় মৌজার ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে জমির সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধভাবে নির্মিত টিনশেড দোকানঘর ভেঙে উচ্ছেদ করা হয় এবং আবেদনকারী পরিবারকে ২১ শতক জমির মধ্যে ১৮ শতকের দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। অবশিষ্ট আড়াই শতকে মালামাল থাকায় দখলকারীদের অনুরোধে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, তারা আইনগত উপায়ে জমি ক্রয় করে নামজারি সম্পন্ন করেন এবং নিয়মিত সরকারি খাজনাও পরিশোধ করে আসছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে একটি পক্ষ রাতারাতি জমি দখল করে সেখানে দোকানঘর নির্মাণ করে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে সালিশ-বিচার হলেও কোনো সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-এর সহায়তা নেওয়ার পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পান।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের মহজমপুর গ্রামের অভিজিৎ সরকার ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত সাফ কবালা দলিলের মাধ্যমে সুখাইড় মৌজার আরএস ৩৩৫ ও ৬০৫ নম্বর দাগে মোট ১০ শতক জমি ক্রয় করেন। একই সময়ে সুখাইড় গ্রামের ব্রিপেশ চন্দ্র দাস ও অমর চন্দ্র দাস পৃথক আরেকটি দলিলের মাধ্যমে ১১ শতক জমি বিক্রি করেন। সব মিলিয়ে মোট ২১ শতক জমি বৈধভাবে ক্রয় করে নামজারি সম্পন্ন করা হয় এবং সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করা হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর কয়েকজন ব্যক্তি ওই জমিতে অবৈধভাবে দোকানঘর নির্মাণ করে দখল নেন। এতে প্রকৃত মালিকরা জমি ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হন। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশ হলেও দখলকারীরা জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। পরে জমির মালিক অভিজিৎ সরকার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন এবং তার শ্বশুর দীপু দাসকে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে জমি দেখভালের দায়িত্ব দেন।
এরপর দীপু দাস গত ১৪ মে ধর্মপাশা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন অনুযায়ী লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন একাধিকবার নোটিশ প্রদান করে এবং তদন্ত শেষে সরেজমিনে গিয়ে দখল উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে।
অভিযান চলাকালে প্রশাসনের উপস্থিতিতে জমির সীমানা নির্ধারণ করা হয় এবং অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনা অপসারণ করা হয়। এতে দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান ঘটে এবং প্রকৃত মালিক পরিবার স্বস্তি ফিরে পায়। এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অবৈধ দখলদারদের জন্য একটি শক্ত বার্তা হয়ে থাকবে।
অভিযোগকারী ও জমির মালিক অভিজিৎ সরকারের শ্বশুর দীপু দাস বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার ছিলাম। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সহযোগিতায় ন্যায়বিচার পেয়েছি। অবশিষ্ট আড়াই শতক জমিও এক সপ্তাহের মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।”
ধর্মপাশা উপজেলা সার্ভেয়ার মো. রুহুল আমীন জানান, জমির কাগজপত্র, রেকর্ড এবং বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রকৃত মালিককে জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে জমির মালিককে ১৮ শতক জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট আড়াই শতকে মালামাল থাকায় দখলকারীরা এক সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। নির্ধারিত সময় শেষে বাকি জমিও মালিকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত জালিয়াতি, প্রতারণা ও অবৈধ দখল রোধে একটি যুগান্তকারী আইন। ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে আইনটি কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ মানুষ দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ধর্মপাশার এই ঘটনাও সেই আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এ ধরনের দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে ভূমি দখল, জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং প্রকৃত মালিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবেন।

Reporter Name 















