মাহবুব হোসেন মেজর, দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলা হাকিমপুরে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। হাকিমপুর থানা পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতায় গত প্রায় সাত মাসে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪৫২ জনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে মোট ৮৬টি মামলা করা হয়েছে।
হাকিমপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত হাকিমপুরে মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মাদক সংশ্লিষ্ট মামলায় ২৪২ জন এবং মাদক সেবনের অভিযোগে ২১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় মাদকের সরবরাহ ও সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, শুধু মাদক বহনকারী বা সেবনকারীদের নয়, মাদকের সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হিলি পৌরসভাসহ ডাঙ্গাপাড়া (খট্রা), বোয়ালদাড় ও আলিহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহল পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতার কারণে আগের তুলনায় এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা কমেছে। তবে মাদক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে অভিযান আরও নিয়মিত ও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হাকিমপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় হাকিমপুরে মাদকের বিস্তার একটি বড় সমস্যা। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের চলমান কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, মাদকের সঙ্গে কোনো আপস করা উচিত নয়। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পুলিশের অভিযানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
হাকিমপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শিল্পী বলেন, মাদকসেবীদের শনাক্ত করতে পরীক্ষার জন্য একটি ডিভাইস কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মাদকসেবীদের শনাক্ত করা সহজ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার মতে, চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে হিলিতে মাদকের প্রবণতা আরও কমবে।
হাকিমপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলী বলেন, শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
২ নম্বর বোয়ালদাড় ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হক বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান প্রশংসনীয়। পুলিশের কঠোর তৎপরতার কারণে গ্রামগঞ্জে আগের তুলনায় মাদক পাওয়া কঠিন হয়েছে। তবে যারা এখনও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
হাকিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় হিলিতে মাদকের সহজলভ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাদকের সঙ্গে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে মসজিদ, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল ও কলেজে সভা-সেমিনার করা হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড়িয়ে নিতে কেউ সুপারিশ বা তদবির করলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আ ন ম নিয়ামত উল্লাহ বলেন, মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় হাকিমপুরে মাদক নিয়ন্ত্রণ পুলিশের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ। তাই খুচরা বিক্রেতা ও সেবনকারীদের পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ ব্যবস্থার মূল হোতাদের শনাক্ত করাও পুলিশের অন্যতম লক্ষ্য।
স্থানীয়দের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে হাকিমপুরকে মাদকমুক্ত করার পথ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন তারা।