মোঃ ইলিয়াছ খান (সালথা উপজেলা) প্রতিনিধি ফরিদপুর:
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও সহিংসতার ইতিহাস থেকে বেরিয়ে এসে শান্তি, সম্প্রীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে স্বেচ্ছায় দেশীয় অস্ত্র জমাদানের মাধ্যমে এলাকায় গড়ে উঠেছে একটি নতুন সামাজিক পরিবেশ, যা পুরো জেলায় ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বুধবার (১০ জুন) বিকেলে মাঝারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের কাছে থাকা দেশীয় অস্ত্র প্রশাসনের কাছে জমা দেন। বহু বছরের পুরোনো বিরোধ, সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং পারিবারিক শত্রুতা ভুলে গিয়ে মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে এগিয়ে আসে।
স্থানীয় প্রশাসন এই উদ্যোগকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কার্যক্রম হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে দেখছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই মনে করেন, এই ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অস্ত্র জমাদানকারীদের ফুল দিয়ে বরণ করা। সাধারণত এমন কার্যক্রমে শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেলেও সালথার এই উদ্যোগ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে শাস্তির পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে সম্মান, সামাজিক স্বীকৃতি এবং ইতিবাচক উৎসাহ। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়েছে।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাবলুর রহমান খানের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন, সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যারা স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দিয়েছেন তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত হবেন। তার মতে, প্রশাসন শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের অংশীদারও।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ছোট-বড় নানা ধরনের বিরোধ চলছিল, যার অনেকাংশই দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতায় রূপ নিত। কিন্তু বর্তমান উদ্যোগ সেই চিত্র পরিবর্তনের একটি বাস্তব পদক্ষেপ। তারা মনে করেন, এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে সালথা একটি শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ উপজেলা হিসেবে পরিচিতি পাবে।
সাধারণ মানুষও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগে এলাকায় ছোটখাটো বিষয় নিয়েও বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকত। এখন মানুষ ধীরে ধীরে সহিংসতার পথ ছেড়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের দিকে ঝুঁকছে। তারা মনে করেন, প্রশাসনের এই ইতিবাচক ভূমিকা সমাজে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা এবং সম্মান প্রদানের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমানো সম্ভব। সালথার এই উদ্যোগ সেই তত্ত্বের একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে মানুষকে ভয় দেখানোর পরিবর্তে তাদের ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা সমাজে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকেই জানান, তারা ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়াতে চান না। বরং শান্তিপূর্ণভাবে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে নিতে চান। এই মানসিক পরিবর্তনই পুরো উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শেষ পর্যায়ে উপস্থিত সবাই শান্তি, সম্প্রীতি এবং অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পুরো পরিবেশে ছিল এক ধরনের উৎসবমুখর আবহ, যেখানে ভয় নয় বরং ছিল আশা ও বিশ্বাসের পরিবেশ।
এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে ফরিদপুর জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, সালথার এই মডেল অনুসরণ করলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
সালথায় দেশীয় অস্ত্র জমাদান কার্যক্রম শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক বিপ্লবের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি প্রমাণ করেছে, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে যে কোনো সমাজেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।