গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের নালিয়াটেকি গ্রামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংবাদিকের ছদ্মবেশে ধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলের গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মো. সজিব (৩৫) নামে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন। সম্প্রতি এক গৃহবধূর দায়ের করা মামলার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত সজিব বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করে এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন। পরে ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সেটি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে দীর্ঘদিন ব্ল্যাকমেইল করা হয়। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ওই নারী শ্রীপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর থেকেই শ্রীপুরে সজিবের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সজিব বিল্লাল পালোয়ানের ছেলে। তিনি ২০১২ সালে এসএসসি পাসের পর ধলাদিয়া ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। পরে মুন্সীগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হলেও একাধিক সেমিস্টারে অকৃতকার্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার পর তিনি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতেন। স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক সমস্যায় থাকা বিবাহিত নারীদের টার্গেট করে তিনি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। এরপর গোপনে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখাতেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অর্থ আদায় এবং যৌন শোষণের চেষ্টাও করা হয়েছে।
এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে বিভিন্ন দপ্তরে দালালি, জমির নামজারির নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং সামাজিক বিরোধ উসকে দিতে ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশের মতো কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগও রয়েছে বলে এলাকাবাসীর দাবি।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগ ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পূর্বে একটি ধর্ষণ মামলায় কারাভোগও করেছেন। তবে কারামুক্ত হওয়ার পরও তিনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ছিলেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘদিন ভয় ও সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু অভিযুক্তের হুমকি ও মানসিক নির্যাতন বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আর কোনো নারী যেন এমন ঘটনার শিকার না হন।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু হয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন। তিনি বলেন, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান চলছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ভয় ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকে মুখ খুলতে পারেননি। সাম্প্রতিক মামলার পর অন্য সম্ভাব্য ভুক্তভোগীরাও সামনে এসে আইনি সহায়তা চাইতে পারেন বলে তারা মনে করছেন। এলাকাবাসী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের পাশাপাশি ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ফৌজদারি অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে কোন কোন ধারায় অভিযোগ আনা হবে, তা তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, সাংবাদিকতার মতো সম্মানজনক পেশার পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। উল্লেখ্য, অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।