মোঃ সোহেল রানা রাজশাহী
রাজশাহীর মোহনপুর ও তানোর উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ কমাতে এগিয়ে চলছে গুরুত্বপূর্ণ মোহনপুর-তানোর সড়ক উন্নয়ন কাজ। মোহনপুর উপজেলার সইপাড়া থেকে তানোর উপজেলার গোল্লাপাড়া সীমানা পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালী করার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সড়কটির কাজ শেষ হলে দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসানের আশা
দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশ খানাখন্দ, ভাঙন ও সরু অবস্থার কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে বড় যানবাহন চলাচল, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং রাতে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে মানুষকে বাড়তি ঝুঁকি নিতে হতো।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যেত। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত সৃষ্টি এবং পাশের অংশ ভেঙে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা দেখা দিত। এতে প্রায়ই যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতো।
তানোর থেকে মোহনপুর হয়ে রাজশাহী শহরের দিকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই রাজশাহীর সড়ক উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই পথের উন্নয়ন স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কৃষিপণ্য পরিবহনে আসবে গতি
সড়কটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এলাকার কৃষকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ধান, সবজি, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর দ্রুত বাজারে পৌঁছে দেওয়া কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আলীম মন্ডল বলেন, রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য নিয়ে বাজারে যেতে বেশি সময় লাগত। গাড়ি ভাড়াও বেশি পড়ত এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। সড়কের কাজ ভালোভাবে শেষ হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা কৃষকদের পরিবহন খরচ কমাতে এবং সময় সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ কমবে
সড়কটি সরু ও ভাঙাচোরা হওয়ায় যানবাহন চালকদের দীর্ঘদিন নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। দুটি বড় যানবাহন পাশাপাশি অতিক্রম করার সময় ঝুঁকি তৈরি হতো। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশ ভেঙে যাওয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হতো।
স্থানীয় পরিবহন চালক সোহাগ রানা বলেন, আগে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে গর্ত ছিল এবং সরু হওয়ার কারণে দুটি গাড়ি একসঙ্গে চলাচলে সমস্যা হতো। রাতে গাড়ি চালানো আরও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। উন্নয়নকাজ শেষ হলে গাড়ি চালানো সহজ হবে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমবে বলে তিনি মনে করেন।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াত হবে সহজ
মোহনপুর ও তানোর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীরা এই সড়ক ব্যবহার করে স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন। বর্ষার সময় রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যেত।
স্থানীয় শিক্ষার্থী মুমতাহিনা মম বলেন, রাস্তা খারাপ থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে অনেক সময় লাগত। বৃষ্টির সময় কাদা ও গর্তের কারণে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ত। সড়কের উন্নয়ন শেষ হলে নিয়মিত যাতায়াত অনেক সহজ হবে বলে তিনি আশা করেন।
প্রায় ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হচ্ছে সড়ক
প্রকল্পের আওতায় সড়কটির নির্ধারিত প্রশস্ততা প্রায় ১৮ ফুট করা হচ্ছে। সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ড্রেন, কালভার্ট ও ব্রিজের কাজ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজও করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। তবে এখনো মূল কার্পেটিং বা পিচ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়নি। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বর্ষা ও অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক মাস কাজের গতি কিছুটা কম ছিল। সড়কের বিভিন্ন অংশের পাশে পুকুর ও জলাশয় থাকায় বৃষ্টির পানি এবং স্রোতে নির্মাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু জায়গায় পুনরায় কাজ করতে হয়েছে।
গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি
সড়কের উন্নয়নকাজে গুণগত মান বজায় রাখতে রাজশাহী এলজিইডি ও মোহনপুর এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ পরিদর্শন করছেন বলে জানা গেছে।
মোহনপুর উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা রকিব হাসান বলেন, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিদর্শন করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মোহনপুর এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী রিপন আলী সরকার বলেন, সড়কটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নির্ধারিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, মোহনপুর-তানোর সড়ক উন্নয়ন কাজ টেকসই ও ভালো মানের হবে। কাজ শেষ হলে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি উন্নত সড়ক শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তাই রাজশাহীর সড়ক উন্নয়ন কার্যক্রমের এই প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে মোহনপুর ও তানোর উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।