মোঃ ইলিয়াছ খান (সালথা উপজেলা) প্রতিনিধি, ফরিদপুর
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, একটি পুরোনো কাঁচি এবং একটি ক্ষুর—এই তিনটিই যেন এক মানুষের জীবনের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী। সেই মানুষটির নাম অকিল শীল। বয়স এখন ৮৭ বছর। তবুও জীবিকার তাগিদ ও কাজের প্রতি অগাধ ভালোবাসা নিয়ে তিনি এখনো বসেন বাজারের পুকুর পাড়ে। গত ৬৬ বছর ধরে মাঝারদিয়া বাজারের নাপিত হিসেবে মানুষের চুল ও দাড়ি কেটে চলেছেন তিনি।
স্থানীয়দের কাছে তিনি শুধু একজন নাপিত নন, বরং গ্রামের পুরনো দিনের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। আধুনিক সেলুন, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নতুন নতুন দোকান বাজারে এলেও পুকুর পাড়ের সেই ছোট্ট জায়গাটি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এখানেই বসে নিজের পুরোনো কাঁচি ও ক্ষুর দিয়ে অকিল শীল সেবা দিয়ে যাচ্ছেন গ্রামবাসীকে।
জানা যায়, অকিল শীলের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চৌমুখা এলাকায়। তার পিতা হরিবদন শীলও একই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ছোটবেলা থেকেই তিনি নাপিতের কাজ শিখে নেন। তখন গ্রামাঞ্চলে আধুনিক সেলুনের প্রচলন ছিল না। তাই বাজারের পুকুর পাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালাতেন তিনি।
মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। হাটের দিন সকালে অকিল শীল ঠিক সময়ে এসে পুকুর পাড়ের সেই নির্দিষ্ট স্থানে বসেন। একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি পেতে বসে পড়েন কাজ নিয়ে। হাতে থাকে তার বহুদিনের সঙ্গী পুরোনো কাঁচি ও ক্ষুর। সেখানেই তিনি গ্রাহকদের চুল ও দাড়ি কেটে দেন।
বয়সের ভার এখন স্পষ্ট। তবুও কাজের প্রতি তার আগ্রহে কোনো ভাটা পড়েনি। প্রতিটি গ্রাহকের চুল কাটতে তিনি এখনো মনোযোগী ও ধৈর্যশীল। পুকুর পাড়ে বসে কাজ করার দৃশ্যটি যেন গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত চিত্র।
সরাসরি গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট সেই জায়গাটিতে বসে অকিল শীল মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন গ্রাহক। কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে অপেক্ষা করছেন। অনেকের কাছে এই স্থানটি শুধু চুল কাটার জায়গা নয়, বরং শৈশবের স্মৃতি আর গ্রামের পুরনো দিনের গল্পের ঠিকানা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকেই অকিল শীলের কাছেই চুল কাটাই। তার হাতে চুল কাটালে আলাদা একটা ভালো লাগে।”
আরেকজন গ্রাহক জানান, “এখানে ধনী-গরিব সবাই আসে। অকিল শীলের কাছে চুল কাটাতে যেন এক ধরনের অন্যরকম আনন্দ আছে।”
অকিল শীল নিজেও জানান, বর্তমানে প্রতি জনের চুল কাটার জন্য তিনি ৫০ টাকা করে নেন। হাটের দিনে তার কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। এই সামান্য আয় দিয়েই তিনি সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুর পাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, তবুও কাজ না করলে মন ভালো লাগে না।”
অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাদের কেউই এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নন। তবুও তিনি মনে করেন, এই পেশাই তার জীবনের বড় পরিচয়।
স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অকিল শীলের এই পুকুর পাড়ের সেলুন। আধুনিকতার ভিড়ে তার এই সরল জীবনযাপন এবং দীর্ঘ কর্মজীবন যেন গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য ইতিহাস হয়ে আছে।
আজও হাটের দিনে পুকুর পাড়ে বসে হাতে কাঁচি ও ক্ষুর নিয়ে পুরনো গ্রাহকদের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। কাঁচির টুং টুং শব্দেই যেন লেখা হয়ে চলেছে অকিল শীলের জীবনের ৬৬ বছরের গল্প।