বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে ঢাকা প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে এক বর্ণাঢ্য মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংহতি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (৩ মে) আয়োজিত এই কর্মসূচি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবিতে পরিণত হয়।
এদিন জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় সকাল থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী, সম্পাদক, সাংবাদিক, সামাজিক সংগঠক এবং পেশাজীবী নেতারা জড়ো হতে থাকেন। তাদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— “সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করো”, “মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করো”, “গণমাধ্যমের নিরাপত্তা চাই” ইত্যাদি স্লোগান।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা প্রেস ক্লাব ও আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাবের সভাপতি আওরঙ্গজেব কামাল। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম রাষ্ট্র, সমাজ ও সরকারের মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। তিনি বলেন, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ মানে জনগণের কণ্ঠরোধ। তাই স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সত্য প্রকাশে সাংবাদিকদের নির্ভীক ভূমিকা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সাংবাদিকরা নানা ধরনের চাপ, ভয়ভীতি ও অপপ্রচারের মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিক সমাজকে আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি এস এম হানিফ আলী। তিনি বলেন, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি সত্য, ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। তিনি উল্লেখ করেন, গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ। এই দর্পণকে বিকৃত করার যেকোনো চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের উপদেষ্টা এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অর্গানাইজেশন (এফবিজেও)-এর চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এস এম মোরশেদ। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করে কোনো দেশ কখনো টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা জাতির চোখ ও কণ্ঠস্বর। তাদের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে জনগণের অধিকার রক্ষা করা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভুয়া তথ্য, গুজব এবং বিভ্রান্তি বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
ঢাকা প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। অনেক সময় তারা হামলা, মামলা এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার শিকার হন। তিনি সাংবাদিকদের সুরক্ষায় একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
স্বদেশ বিচিত্রার সম্পাদক আশোক ধর বলেন, গণমাধ্যম স্বাধীন না হলে সমাজে দুর্নীতি ও অন্যায় বেড়ে যায়। স্বাধীন সাংবাদিকতা সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। তিনি বলেন, গণমাধ্যম জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় এবং রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি তুলে ধরে।
লায়ন মোঃ ইব্রাহিম ভূঁইয়া বলেন, সত্য প্রকাশে সাংবাদিকদের সাহসী ভূমিকা জাতিকে আলোকিত করে। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখেন, তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব।
মোঃ শাহিন আলম আসিক বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি না রেখে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। কারণ ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজই স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে।
মোঃ ইদি আমিন এপোলো বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের বিষয় নয়; এটি পুরো জাতির অধিকার। তিনি গণমাধ্যমের ওপর সব ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বন্ধ করার আহ্বান জানান।
মোঃ আজাহার আলী বলেন, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সমাজকে সচেতন করে এবং দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।
এছাড়া মোঃ ওবাইদুল ইসলাম, মোঃ হেকমত আলীসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন। তারা সবাই একসঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য— “শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসার”— বাস্তবায়নে সরকার, গণমাধ্যম মালিক, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে— সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করা, গণমাধ্যমের ওপর সব ধরনের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা।
উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ ৩ মে তারিখকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতি বছর এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্ব তুলে ধরা।
ঢাকা প্রেস ক্লাবের এই আয়োজন শুধু একটি মানববন্ধন নয়; এটি ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পক্ষে একটি দৃঢ় অবস্থান। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা আবারও প্রমাণ করেছেন যে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাংবাদিক সমাজ সবসময় ঐক্যবদ্ধ।