সাংবাদিক মাসুদ রানা বাবুল
নরসিংদীতে ভূমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে জেলা শহর। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ঘিরে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম ক্ষোভ। তার পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন কয়েকশ’ ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক।
রোববার (১৯ এপ্রিল) নরসিংদী প্রেসক্লাবের সামনে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিক্ষোভকারীরা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন। এ সময় “দুর্নীতি বন্ধ করো”, “এডিসির পদত্যাগ চাই” এমন নানা স্লোগানে পুরো এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে।
৫-৬ বছরের দীর্ঘ ভোগান্তির অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের কারারদি মৌজায় ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে আটকে আছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে জমির মালিকরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
অনেকেই অভিযোগ করেন, তারা জমি বিক্রি করতে পারছেন না, আবার ব্যাংক ঋণও নিতে পারছেন না। ফলে তাদের আর্থিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কমিশন দাবির অভিযোগে ক্ষোভ
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, জমির ক্ষতিপূরণের চেক ছাড়াতে এডিসি মাহমুদা বেগম ও তার ঘনিষ্ঠদের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের কমিশন দাবি করা হয়েছে। কমিশন না দিলে ফাইল আটকে রাখা বা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অভিযোগও উঠেছে।
অনেক ভুক্তভোগী দাবি করেন, কমিশন না দেওয়ায় তাদের জমির অধিগ্রহণ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশের অভিযোগ
মানববন্ধনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, একটি প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা হচ্ছে পুরো অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায়। স্থানীয় শিল্পপতি ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সুবিধা দিতে গিয়ে সাধারণ কৃষকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, এ কারণে বহু কৃষক ও শিল্প মালিক আজ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
প্রশাসনিক কার্যালয়ে উত্তেজনা
প্রেসক্লাব থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা সেখানে এডিসি মাহমুদা বেগমের পদত্যাগ দাবিতে টানা স্লোগান দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের কাছ থেকে স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক বলেন, তারা বছরের পর বছর ধরে তাদের পৈতৃক জমির ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। উল্টো অফিসে গেলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
তাদের দাবি, দ্রুত এই দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
স্থানীয় নেতার প্রতিক্রিয়া
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে পুটিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, “এডিসি মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বহুদিন ধরেই উঠছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি এখনো দায়িত্বে আছেন। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
তিনি দ্রুত তার পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।
প্রশাসনের অবস্থান
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এডিসি মাহমুদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর দাবি
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণে চলমান অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগের সঠিক তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।