মো. আরফান আলী:
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় আকস্মিক ভারী বর্ষণে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। গত ১২ ও ১৩ মার্চ গভীর রাতে টানা দুই দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে উপজেলার বিভিন্ন মাঠে থাকা গম, ভুট্টা ও আলুর ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পীরগঞ্জে আকস্মিক বৃষ্টিতে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে থাকা সবুজ ফসল এখন বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। অনেক জায়গায় জমিতে হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে গেছে। ফলে গম, ভুট্টা ও আলুর ক্ষেত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষকদের দাবি, এই সময়টাতে এত ভারী বৃষ্টিপাত সাধারণত হয় না। তাই তারা কেউই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কয়েক মাস ধরে কঠোর পরিশ্রম করে তারা জমিতে ফসল উৎপাদন করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের সেই পরিশ্রম এখন অনিশ্চয়তার মুখে। কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “গম আর ভুট্টার ক্ষেত প্রায় পুরোটা পানির নিচে। যদি দ্রুত পানি না নামে, তাহলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।”
আরেক কৃষক জানান, অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন যদি ফসল নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেই ঋণ পরিশোধ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে কৃষকদের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। অনেক ক্ষেতেই আলুর জমিতে পানি জমে থাকায় আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইভাবে গম ও ভুট্টার ক্ষেতেও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। ফলে পীরগঞ্জের কৃষকের ফসল ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দিন দিন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সময়ের ভারী বৃষ্টিপাত ফসলের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষ করে গম ও আলুর মতো ফসল পানিতে ডুবে থাকলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে যদি দ্রুত পানি নেমে যায়, তাহলে কিছু ফসল রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাসান জানান, আকস্মিক এই বৃষ্টিপাতে কৃষকদের কিছু ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে। তালিকা সম্পন্ন হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে বাংলাদেশ পল্লী ফেডারেশনের নির্বাহী পরিচালক, কবি ও সাংবাদিক বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছরই কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই সরকার যদি কৃষি খাতে বীমা ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে ক্ষুদ্র কৃষকরা অন্তত কিছুটা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। এতে কৃষকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, কৃষকদের সুরক্ষায় আগাম আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা প্রদান করা হলে তারা আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে কৃষকের ক্ষতি অপূরণীয় হলেও সবাই আশা করছেন দ্রুত মাঠের পানি নেমে যাবে এবং কৃষকরা আবার নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করতে পারবেন। কৃষিই এই অঞ্চলের প্রধান জীবিকা হওয়ায় কৃষকের পুনরুদ্ধার পুরো এলাকার অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।