মোঃ শাহজাহান কবির প্রধান জেলা প্রতিনিধি:
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের টোকাপাড়া এলাকায় এক আবাসিক মাদরাসা ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। নিহত জুবায়ের রহমান (১৫) নামে ওই শিক্ষার্থী স্থানীয় একটি হাফেজিয়া মাদরাসার আবাসিক ছাত্র ছিল। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। তবে চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে “পঞ্চগড়ে মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যু” এবং “রহস্যজনক মৃত্যু” বিষয় দুটি এখন স্থানীয় মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নিহত জুবায়ের রহমান ঠাকুরগাঁও জেলার ভূল্লী উপজেলার বাসিন্দা জাকিরুল ইসলামের ছেলে। সে টোকাপাড়া তালিমুল কোরআন হাফেজিয়া মাদরাসার হাফেজ রিভিশন বিভাগের ছাত্র ছিল। পরিবার ও সহপাঠীদের কাছে সে ভদ্র ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার আছরের নামাজের পর জুবায়ের তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বাইরে খেলতে যায়। খেলার একপর্যায়ে তারা এলাকার একটি নির্মাণাধীন মসজিদের ছাদে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে থাকা বিদ্যুতের মেইন লাইনের তারের সংস্পর্শে এসে জুবায়ের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। পরে সে ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায়।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও মাদরাসার শিক্ষকরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু তার আগেই সে মারা যায়।
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, জুবায়েরের শরীরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কিছু চিহ্ন পাওয়া গেলেও মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মাহবুব আলম জানান, জুবায়ের পেটে তীব্র ব্যথার কথা বলেছিল। পরে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করলে দেখা যায়, ওপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার আঘাতে তার কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভেতরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।
চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার চেয়ে ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার আঘাতই তার মৃত্যুর মূল কারণ হতে পারে। এই বক্তব্যের সঙ্গে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দাবির পার্থক্য থাকায় পুরো ঘটনায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিকে, “রহস্যজনক মৃত্যু” নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, আসলে কীভাবে মারা গেল জুবায়ের? বিদ্যুতের শকে, নাকি ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আঘাতে? যদিও এখন পর্যন্ত পরিবার থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
পঞ্চগড় সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ না থাকায় মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন খোঁজখবর নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
জুবায়েরের মৃত্যুতে তার পরিবার, সহপাঠী এবং এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি সম্ভাবনাময়ী হাফেজ ছাত্রের এমন অকাল মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে খোলা বৈদ্যুতিক তার ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শিশু-কিশোরদের যাতায়াত বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আরও ঘটতে পারে।