এনামুল হক রাশেদী
বাংলাদেশের সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে চলছে বিজয়ের উল্লাস ও পরাজয়ের ব্যাখ্যা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন কেবল জয়-পরাজয়ের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এটিকে জনগণের রায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ রায়ের প্রতি সম্মান জানানোই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়। বিজয়ী জোটের প্রতি অভিনন্দন জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল আশা প্রকাশ করেছে—তারা জনরায়ের মর্যাদা দিয়ে দায়িত্বশীল রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ নির্বাচনে বিরোধী দলে থাকলেও নিজেদের রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে না। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন—নির্বাচন সুষ্ঠু হলে যেকোনো ফলাফল মেনে নেওয়া হবে এবং গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা হবে। ফলাফল ঘোষণার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে তিনি জানান, দলটি নীতিবান ও শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৭৭টি আসন নিয়ে সংসদে জামায়াতের উপস্থিতি প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে নেমে গিয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় পর আবার সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে।
তবে নির্বাচন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছে জামায়াত। প্রার্থী বাছাইয়ে কারচুপি, ফলাফলের কাগজে ঘষামাজা এবং কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকেও দলটি ‘ফ্যাসিবাদী তৎপরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেড় দশকের বেশি সময় রাজনৈতিক চাপে থাকার পরও জামায়াতের ঘুরে দাঁড়ানো একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির–এর সক্রিয় উপস্থিতি দলটির প্রতি প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির বাস্তবতা ভিন্ন—এই নির্বাচনে তা স্পষ্ট হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করেন, বিরোধী দলে থাকাই আপাতত জামায়াতের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক। এতে তারা সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে পারবে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত—এই নির্বাচন কেবল কে জিতল আর কে হারল, সেই প্রশ্নের উত্তর নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশের রাজনীতি আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ধারায় ফিরছে। বিএনপি সরকার গঠন করলেও তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—কার্যকর শাসন ও জনআস্থা ধরে রাখা।
গণতন্ত্রে শেষ কথা কোনো একক নির্বাচনে লেখা হয় না; শেষ কথা লেখা হয় জনগণের আস্থায়।