মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে জ্বালানি খাতে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মার্চ মাসের প্রথম ১৭ দিনেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), এলপিজি ও পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী মোট ২২টি জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ বাংলাদেশ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে এই জাহাজগুলোর আগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শুধু তাই নয়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আরও অন্তত চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহকে আরও শক্তিশালী করবে।
সূত্র মতে, মার্চের ৩ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে কাতার থেকে চারটি জাহাজে করে ৩ লাখ ৩০ হাজার টনের বেশি এলএনজি দেশে এসেছে। আল জোর, আল জাসাসিয়া, লুসাইল ও আল গালায়েল নামের এসব জাহাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে খালাস কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এসব চালান দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
অন্যদিকে এলপিজি সরবরাহেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। মালয়েশিয়া থেকে আসা ‘মর্নিং জেন’ ২ হাজার ৫০০ টন এলপিজি সরবরাহ করেছে। ভারত থেকে আসা ‘সেন্না-৯’ জাহাজ ৫ হাজার ৭৬৭ টন এবং ‘এপিক সান্টা’ ৫ হাজার ৫০০ টন এলপিজি নিয়ে এসেছে। এছাড়া ‘স্কুমি-৭’ সীতাকুণ্ড এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ টন এলপিজি খালাস করেছে। ওমান থেকে আগত ‘এলপিজি সেভান’ কুতুবদিয়ায় প্রায় ৭ হাজার ২০ টন এলপিজি খালাস করছে, যা মার্চের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিশোধিত জ্বালানির ক্ষেত্রেও সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। ‘ইলেন্দ্র স্প্রুস’ ও ‘হাফিনা ববক্যাট’ নামের জাহাজ দুটি প্রায় ২০ হাজার টন করে উচ্চ সালফারযুক্ত ফুয়েল অয়েল নিয়ে এসেছে। এছাড়া ‘বে ইয়াসু’ জাহাজে ৫ হাজার ১৯ টন মনোইথিলিন গ্লাইকোল (এমইজি) আমদানি করা হয়েছে, যা শিল্প খাতে ব্যবহৃত হবে।
ডিজেলজাতীয় জ্বালানি সরবরাহও স্থিতিশীল রয়েছে। ‘জিউ চি’, ‘লিয়ান হুয়ান হু’ ও ‘এসপিটি থেমিস’ জাহাজ সম্মিলিতভাবে ৮৫ হাজার টনের বেশি গ্যাস অয়েল সরবরাহ করেছে। ‘র্যাফেলস সামুরা’ ২৮ হাজার টন এবং ‘চ্যাং হাং হোং তু’ আরও ৫ হাজার টন জ্বালানি খালাস করছে। এছাড়া ‘অ্যাঞ্জেল নম্বর-১১’ জাহাজে ২ হাজার ৫ টন বেস অয়েল এসেছে, যা লুব্রিকেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প খাত সচল রাখতে এই জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এদিকে বর্তমানে চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের পথে রয়েছে। এর মধ্যে কাতার থেকে এলএনজি বহনকারী ‘লেব্রেথাহ’ এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ‘প্রাচী’ জাহাজে প্রায় ৭৪ হাজার ৯২৯ টন এলএনজি রয়েছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে ‘লেডি অব ডোরিয়া’ ও ‘এসসি গোল্ড ওশেন’ নামের জাহাজ আসছে, যেগুলো উচ্চ সালফারযুক্ত ফুয়েল অয়েল বহন করছে।
মার্চের শেষ দিকে আরও কয়েকটি জাহাজ আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে অ্যাঙ্গোলা থেকে ‘সোনাগোল বেনগুয়েলা’, থাইল্যান্ড থেকে ‘এবি অলিভিয়া’ এবং এলপিজি ক্যারিয়ার ‘বেয়ক বর্নহোম’ ও ‘মর্নিং জেন’ উল্লেখযোগ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে সব ধরনের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ বাংলাদেশে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশের জ্বালানি সংকট অনেকাংশে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।