চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা মাছের নমুনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় পারদ (মার্কারি) শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)। সংস্থাটির সমীক্ষা অনুযায়ী, কিছু মাছে সহনীয় সীমার তুলনায় ৫০ গুণেরও বেশি পারদ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পুকুর ও দিঘিতে চাষ করা মাছে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্য প্রকাশের পর চট্টগ্রামের মাছে পারদ দূষণ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পবর্জ্য, ইলেকট্রনিক বর্জ্য, দূষিত জলাশয় এবং নিম্নমানের মাছের খাদ্যের মাধ্যমে বিষাক্ত ভারী ধাতু জলজ পরিবেশে প্রবেশ করছে। পরে তা মাছের শরীরে জমা হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে পৌঁছাচ্ছে।
ইএসডিওর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন খামার, পুকুর ও জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা মাছের নমুনা পরীক্ষায় বড়, মাঝারি ও ছোট প্রায় সব ধরনের মাছেই পারদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারদ একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ভারী ধাতু। এটি একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে সহজে নষ্ট হয় না। শিল্পকারখানার বর্জ্য, কয়লা পোড়ানো, ব্যাটারি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ইলেকট্রনিক বর্জ্যের মাধ্যমে পারদ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে নদী, খাল, বিল ও সমুদ্রের পানিতে জমা হয়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করে।
দীর্ঘদিন মাছে মার্কারি যুক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিশুদের মেধা ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও স্মৃতিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া কিডনি ও লিভারের জটিলতা, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার এবং গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায়ও বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাছে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও কিছু গবেষণায় সামুদ্রিক মাছের পারদের মাত্রা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, তবুও গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে দূষণের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রতি বছর ৭০ হাজার টনের বেশি মিঠা পানির মাছ উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি নদী ও সাগর থেকে দুই লাখ টনেরও বেশি মাছ আহরণ করা হয়। এসব মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ এবং বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ফলে চট্টগ্রামের মাছে পারদ দূষণ শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোর করা, ইলেকট্রনিক বর্জ্যের নিরাপদ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, মাছের খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং নিয়মিত মাছ ও জলাশয়ের নমুনা পরীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে বাজারে বিক্রিত মাছে ভারী ধাতুর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাছ চাষিদের সচেতন করা হচ্ছে। তবে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।