গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নে ঝড়বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হওয়ার পর এক বিষণ্ন কৃষকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৬ মে) সকালে উপজেলার টেংরা গ্রামের একটি আকাশমণি গাছ থেকে কবির হোসেন (৬০) নামে ওই কৃষকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত কবির হোসেন টেংরা গ্রামের মৃত আমজাদ আলীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ ও কাঠের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, সাম্প্রতিক ঝড়বৃষ্টিতে তার বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ধান নষ্ট হওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং স্বাভাবিক আচরণ করছিলেন না।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কবির হোসেন ঋণ করে প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। কিন্তু কয়েকদিন আগে হওয়া আকস্মিক ঝড়বৃষ্টি ও দুর্যোগে সেই ধানের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। এতে তিনি গভীর দুশ্চিন্তা ও হতাশার মধ্যে ছিলেন।
নিহতের স্ত্রী সালমা খাতুন জানান, তার স্বামী কৃষিকাজের পাশাপাশি কাঠের ব্যবসাও করতেন। তবে সম্প্রতি ব্যবসার অবস্থাও ভালো যাচ্ছিল না। ধান নষ্ট হওয়ার পর থেকে তিনি খুব চুপচাপ হয়ে যান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তেমন কথা বলতেন না। শুক্রবার রাতে পরিবারের সবার সঙ্গে খাবার খেয়ে ঘুমাতে যান। পরে রাত ১২টার পর তাকে আর ঘরে পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, সকালে স্থানীয় লোকজন বাড়ির পাশের আকাশমণি বাগানে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ দেখতে পান। পরে বিষয়টি পরিবারকে জানানো হয়।
নিহতের মেয়ে রেখা বলেন, “বাবা কয়েকদিন ধরে খুব চিন্তিত ছিলেন। ধান নষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সবসময় হতাশার কথা বলতেন। রাতে কখন ঘর থেকে বের হয়েছেন, কেউ বুঝতে পারেনি।”
স্থানীয় প্রতিবেশী আমির হোসেন জানান, কবির হোসেন খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। কারও সঙ্গে তার কোনো বিরোধ ছিল না। তবে গত কয়েকদিন ধরে তিনি মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন এবং দোকানে বসে ধান নষ্ট ও লোকসানের কথা বলতেন।
স্থানীয় গ্রাম পুলিশ সদস্য শরীফ মিয়া বলেন, সকালে এলাকাবাসীর মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান তিনি। সেখানে গিয়ে একটি আকাশমণি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
এদিকে ধান নষ্টের বিষয়ে কৃষি বিভাগের কোনো সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তা জানতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। তার পরিবর্তে কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ওই কৃষক কীভাবে যোগাযোগ করেছিলেন, তা তার জানা নেই বলে জানান তিনি।
শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহীন আলম রশিদ বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। ধান নষ্ট হওয়ার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দ্রুত সরকারি সহায়তা না পৌঁছালে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। কৃষকদের জন্য সহজ সহায়তা ও মানসিক পরামর্শ সেবা চালুরও দাবি জানিয়েছেন তারা।