ফয়সাল রহমান জনি গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে খাল খনন ও সংস্কার কাজে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে কাগজে-কলমে ৫৯ জন শ্রমিক দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো তালিকাভুক্ত শ্রমিকের উপস্থিতি নেই। শ্রমিকের পরিবর্তে দুইটি এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন ব্যবহার করে দ্রুত খনন কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা বলছেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিক দিয়ে হাতে-কলমে খাল খনন করার কথা থাকলেও পুরো কাজই মেশিননির্ভর হয়ে পড়েছে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের বিস্তারিত ও ব্যয়
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় মোট ১৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫৬ হাজার ৩২২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাঘাটা উপজেলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে।
একটি পদুমশহর ইউনিয়নের দাতিয়া খাল, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৭ টাকা। অপরটি কামালের পাড়া ইউনিয়নের কৈচড়া খাল, যার ব্যয় ২৩ লাখ ২১ হাজার ৬৬৩ টাকা।
সরেজমিনে পাওয়া চিত্র
পদুমশহর ইউনিয়নের দাতিয়া খাল এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুইটি ভেকু মেশিন দিয়ে খনন কাজ চলছে। সেখানে সরকারি তালিকাভুক্ত ৫৯ জন শ্রমিক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৩ জন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা গেছে।
মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মেশিন ব্যবহার করে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। এতে প্রকল্পের কাজের গতি বাড়লেও শ্রমিক নির্ভর সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে।
ভেকু মেশিনের চালক নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার চুক্তিতে তারা কাজ করছেন এবং খরচের টাকা দিচ্ছেন জাহিদ নামে এক ব্যক্তি। তিনি আরও বলেন, “দুইটি ভেকু দিয়ে পাঁচ দিনে প্রায় ৩০০ মিটার খাল খনন করা হয়েছে, খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা।”
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নাইট গার্ড জাহিদ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো প্রকল্পের টাকা লেনদেন ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা জাহিদ নামের ব্যক্তি প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কোনো কর্মকর্তা নন। তিনি মূলত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) একজন নাইট গার্ড হিসেবে কর্মরত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা প্রশাসনিক নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক মুন্না মিয়া ও মাহাবুর রহমান জানান, “আমরা মাত্র তিনজন কাজ করি। প্রতিদিন ৮০০ টাকা করে দেওয়া হয়। তালিকাভুক্ত কোনো শ্রমিক এখানে নেই।”
কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও বিভ্রান্তি
অভিযুক্ত জাহিদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি শুধুমাত্র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন।
প্রকল্পের সদস্য সচিব ও ইউপি সদস্য রোস্তম আলী ভেকু ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শ্রমিক তালিকা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, তাই আপাতত মেশিন দিয়ে কাজ চলছে।
অন্যদিকে প্রকল্প সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দাবি করেন, শ্রমিক তালিকা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমিক দিয়ে কাজ শুরু হবে।
তবে সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মেহেদী হাসান জানান, শুরুতে খালের তল সমান করতে ভেকু ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পরে শ্রমিক দিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হবে।
প্রশাসনের অবস্থান
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল কবির বলেন, প্রকল্পটি পিআইও অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করে কাজ সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ না হলে প্রকৃত সুফল জনগণ পাবে না।