শাকিল হোসেন,কালিয়াকৈর (গাজীপুর)প্রতিনিধিঃ
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় রেলওয়ের জমি দখল করে গড়ে তোলা শতাধিক দোকানপাট ও স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বুধবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে উপজেলার পূর্বচান্দরা মাটিকাটা রেললাইন বাজার, রতনপুর রেলস্টেশন এবং ভান্নারা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই কালিয়াকৈর রেলওয়ে জমি উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম এবং কালিয়াকৈর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাহিম শাহরিয়ার। তাদের সঙ্গে রেলওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র রেললাইনের পাশের জমি অবৈধভাবে দখল করে সেখানে দোকানপাট, টিনশেড ঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করে ভোগদখল করে আসছিল। এতে রেললাইনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল এবং ট্রেন চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একাধিকবার নোটিশ প্রদান, মাইকিং এবং স্বেচ্ছায় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও দখলদাররা তা আমলে নেয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের সময় মাটিকাটা রেললাইন বাজার এলাকায় ভাঙা টিন, বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। শ্রমিকরা দড়ি টেনে টিনের চালা ও ঘরের বেড়া ভেঙে ফেলছেন। অনেক ব্যবসায়ী তড়িঘড়ি করে তাদের মালপত্র সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
উচ্ছেদ হওয়া স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ছোট ওয়ার্কশপ, এমনকি কিছু বসতঘরও। এসব স্থাপনা রেললাইন থেকে মাত্র ১০ থেকে ১২ ফুট দূরে নির্মাণ করা হয়েছিল, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত।
উচ্ছেদের শিকার স্থানীয় ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান ও হাবিবুর হৃদয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও রেলওয়ের অসাধু কর্মচারীদের টাকা দিয়ে এসব দোকান তৈরি করেছিলেন। তাদের হাতে দেওয়া লিজ কাগজ এখন অবৈধ ও নকল বলে দাবি করা হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন সব হারিয়ে পথে বসেছি। যারা লাখ লাখ টাকা নিয়ে নকল কাগজ দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে রেলওয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি জমি দখল করে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র অবৈধভাবে এসব জমি দখল করে আসছিল, যা রেললাইনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
তিনি আরও জানান, উদ্ধারকৃত জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে নকল লিজ কাগজ তৈরি ও সরবরাহকারী চক্রকে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বছরের ৫ আগস্টও একই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার নতুন করে দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।
এ বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, পুনরায় দখল প্রতিরোধে নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হবে এবং ভবিষ্যতে কেউ অবৈধভাবে দখল করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেলওয়ের জমি দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে এবং জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।