এম, এ, মান্নান, স্টাফ রিপোর্টার, নিয়ামতপুর (নওগাঁ):
আজ আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস। দিনটি বিশ্বব্যাপী বজ্রপাত সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে পালন করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। প্রতি বছর বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। কৃষক, জেলে, শ্রমিক এবং খোলা মাঠে থাকা সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে শুধুমাত্র সরকারি ঘোষণা নয়, বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলাই পারে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প এবং আবহাওয়ার অস্থিরতার ফলে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় তালগাছ, খেজুরগাছ ও অন্যান্য উঁচু গাছ কমে যাওয়ায় বজ্রপাতের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের হাওর, বিল এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলে বজ্রপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অনেক কৃষক জমিতে কাজ করার সময়, জেলেরা নদী বা বিলে মাছ ধরার সময় এবং শিশুরা খোলা মাঠে খেলাধুলা করার সময় বজ্রপাতে প্রাণ হারান। তাই এই সময়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা এবং সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় খুবই সহজ, যদি সবাই সচেতনভাবে তা মেনে চলেন। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে বা বজ্রধ্বনি শোনা মাত্র দ্রুত কোনো পাকা ভবন বা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। টিনের ঘর, খড়ের ঘর কিংবা খোলা বারান্দা নিরাপদ নয়।
বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, উঁচু গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার বা একা দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। এতে বজ্রপাতের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। যদি গাড়ির ভেতরে থাকেন, তাহলে জানালা বন্ধ করে গাড়ির ভেতরেই অবস্থান করাই নিরাপদ।
ঘরের ভেতরে থাকলেও সতর্ক থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় প্লাগে সংযুক্ত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার না করাই ভালো। ল্যান্ডফোন ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে পুকুর, নদী, খাল বা যেকোনো জলাশয় থেকে দ্রুত উঠে আসা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপকভাবে তালগাছ ও অন্যান্য উঁচু গাছ রোপণ করলে বজ্রপাতের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি হাওর ও কৃষিপ্রধান এলাকায় নির্দিষ্ট দূরত্বে বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
এছাড়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের বজ্রপাতের পূর্বাভাস দ্রুত মোবাইল ফোনে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সচেতনতা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে যাতে দেশের প্রতিটি মানুষ বজ্রপাত সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারেন।
আসুন, আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবসে আমরা সবাই অঙ্গীকার করি—নিজে সচেতন হব, অন্যকেও সচেতন করব এবং বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে সঠিক বার্তা পৌঁছে দেব। সচেতনতাই পারে অকাল প্রাণহানি রোধ করতে এবং নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।